Thursday, November 21, 2019

মৃত বাবা-মায়ের জন্য করণীয় আমল সমূহ কি কি?


পবিত্র কুরআন এবং হাদীসের আলোকে মৃত বাবা-মায়ের জন্য করণীয় আমল
রচনায়ঃ মোহাম্মদ জাভেদ কায়সার
মহান আল্লাহ তাআলা মানুষকে এই পৃথিবীতে তাঁর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। মানুষ পৃথিবীতে যতদিন বেঁচে  থাকে ততদিনই তার আমল করার সময়। মৃত্যু বরণ করার সাথে সাথে তার আমলের দরজা  বন্ধ হয়ে যায়। তাই পরকালে শান্তিময় জীবন লাভ করতে চাইলে অবশ্যই তাকে  মৃত্যুর পূর্বে ভাল আমল করে যেতে হবে।
আমাদের সমাজের  লোকেরা তাঁদের মৃত পিতা-মাতাদের জন্য অনেক ধরনের আমল করে থাকে। অনেকেই জানতে চান তাঁদের মৃত মা-বাবার জন্য কি দু‘আ এবং সত্কাজ করা যায়- যার  মাধ্যমে তাঁরা শান্তিতে থাকতে পারেন।
বিভিন্ন সহীহ রেফারেন্স (ইন্টারনেট এবং বই) থেকে এই সংক্রান্ত কিছু আমলের মূল বিষয়গুলো একত্র করেছি।
পরম  করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহ সুবহানু ওয়া তাআলা আমাদের সবার জীবিত/মৃত  বাবা-মায়ের প্রতি দয়া করুক এবং তাঁদের উত্তম প্রতিদান প্রদান করুক; আমীন!
--------------------------------------------------------------------------------------
প্রথমেই  আমরা জেনে নেব - মানুষ মৃত্যু বরণ করার পরও কোন ধরণের আমল দ্বারা উপকৃত  হয়ে থাকে। আমরাই বা তাদের জন্য কি করতে পারি। সহীহ হাদীসের দৃষ্টিতে মৃত  ব্যাক্তির জন্য দু’প্রকার আমলের সওয়াব অব্যাহত থাকে।
(১) জীবিত থাকাবস্থায় কৃত আমল । যেমন আল্লাহর রাস্তায় কোন সম্পদ দান করে যাওয়া, নিজের সম্পত্তি সত্কাজে  খরচ করার অসিয়ত করে যাওয়া, সাদকায়ে জারিয়া করে যাওয়া, ইত্যাদি।
(২) এমন আমল, যা মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিত ব্যক্তিগণ করে থাকে। যেমন মৃত ব্যক্তির জন্য মুসলমানদের দোআ ও আল্লাহর দরবারে তার জন্য মাগফেরাত  কামনা করা, মৃত ব্যক্তির জন্য দান-সাদকা করা, তার পক্ষ থেকে হজ্জ করা, রোজা  রাখা ইত্যাদি।
প্রথম প্রকার আমলের বর্ণনাঃমৃত্যুর পর জীবিত অবস্থায় কৃত আমল দ্বারা উপকৃত হওয়ার দলীলঃআবু  হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি নবী করীম (সাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, নবী (সাঃ) বলেন, “মানুষ যখন মারা যায়, তখন সমস্ত আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তবে  তিনটি আমলের দরজা বন্ধ হয়না। (১) সাদকায়ে জারিয়া। (২) যদি এমন সন্তান রেখে  যায়, যে পিতার জন্য আল্লাহর কাছে দু’আ করবে। (৩) যদি এমন দ্বীনি শিক্ষা রেখে যায়, যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয়। [সহিহ মুসলিম: ৪৩১০]
অত্র  হাদীসের মাধ্যমে একথা জানা গেল যে, কোন মানুষ যদি জীবিত থাকা অবস্থায়  সাদকায়ে জারিয়া করে যায়, তাহলে উক্ত সাদকা দ্বারা যতদিন মানুষ উপকৃত হবে,  ততদিন পর্যন্ত সাদকা কারীর আমল নামায় সওয়াবের একটা অংশ পৌঁছতে থাকবে। এমনি  ভাবে যদি কোন মুসলমান দ্বীনি কোন শিক্ষা রেখে যায় যেমন ইসলামী বই-পুস্তক  রচনা করা, ছাত্রদেরকে দ্বীনি শিক্ষা প্রদান করা, ইসলামী লাইব্রেরী বা দ্বীনি প্রতিষ্ঠান নির্মান করা, নির্মানে অংশ গ্রহণ করা ইত্যাদি। অনুরূপভাবে যদি কেহ সৎ সন্তান রেখে যায় এবং সে সন্তান আল্লাহর কাছে  পিতা-মাতার নাজাতের জন্য দু’আ করে, তাহলে সে দু’আর মাধ্যমে তারা উপকৃত হবে।
দ্বিতীয় প্রকারঃএক্ষেত্রে আমরা কয়েকটি আমলের উল্লেখ করব যা দ্বারা মৃত ব্যক্তি উপকৃত হবে অথচ সে এসব আমল করে যায়নি, বা এসব আমলের কারণও ছিল না।
(১) মৃত ব্যক্তির জন্য মুসলমানদের দু‘আ এবং আল্লাহর নিকট তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করাঃ এব্যাপারে কুরআন ও হাদীসে অনেক দলীল রয়েছে। আল্লাহ তায়া‘লা বলেনঃ“তারা (মু’মিনগণ) বলে: “হে আমাদের পালনকর্তা আমাদেরকে এবং আমাদের পূর্বে যারা  ঈমান এনেছে, তাদেরকে ক্ষমা করো। আর ঈমানদারদের বিরোদ্ধে আমাদের অন্তরে কোন  বিদ্বেষ রেখো না।” (সূরা হাশরঃ ১০)
আল্লাহ তায়ালা মৃত বা জীবিত পিতা-মাতা ও মুমিদের জন্য দু‘আ করার পদ্ধতি শিক্ষা দিয়ে বলেনঃ“হে আমাদের প্রভু! রোজ কিয়ামতে আমাকে, আমার পিতা-মাতা ও সকল মুমিনকে ক্ষমা করে দিন।” (সুরা ইবরাহীমঃ ৪১)
এছাড়া আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পিতা-মাতার জন্য দু‘আ করার বিশেষ নিয়ম শিক্ষা দিতে গিয়ে বলেনঃ“এবং তুমি বল, হে আমার প্রতিপালক! তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।” (সূরা বানী ইসরাঈলঃ ২৪)
হাদীসে  যে সমস্ত দলীল রয়েছে তা থেকে আবু দাউদ শরীফে বর্ণিত উসমান বিন আফফান (রাঃ)  কর্তৃক বর্ণিত হাদীসটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উসমান (রাঃ) বলেন, নবী করীম  (সাঃ) মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার পর তার কবরের পার্শ্বে দাঁড়াতেন এবং বলতেন,  “তোমরা তোমাদের ভায়ের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তার জন্য  ঈমানের উপর অবিচলতা ও দৃঢ়তা কামনা কর, কেননা এখনই তাকে প্রশ্ন করা হবে।”
এছাড়া  কবর যিয়ারতের ব্যাপারে যে সমস্ত দু‘আ হাদীসে এসেছে, তাতে একথারই প্রমাণ  রয়েছে যে, মৃত ব্যক্তির জন্য দু‘আ করলে সে দু‘আর মাধ্যমে সে উপকৃত হবে।
(২) দান-সাদকা করা, বিশেষ করে সাদাকায়ে জারিয়া প্রদান করাঃ মা-বাবা  বেচে থাকতে দান-সাদকাহ করে যেতে পারেন নি বা বেচে থাকলে আরো দান-সাদকাহ করতেন, সেজন্য তাদের পক্ষ থেকে সন্তান দান-সাদকাহ করতে পারে। হাদীসে এসেছে,আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেনঃ ‘‘জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমার মা হঠাৎ মৃতু বরণ  করেছেন। তাই কোন অসিয়ত করতে পারেন নি। আমার ধারণা তিনি যদি কথা বলার সুযোগ  পেতেন তাহলে দান-সাদকা করতেন। আমি তাঁর পক্ষ থেকে সাদকা করলে তিনি কি এর  সওয়াব পাবেন ? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন হ্যাঁ, অবশ্যই পাবেন।’’ [সহীহ মুসলিম:২৩৭৩]
তবে সবচেয়ে উত্তম  হচ্ছে সাদাকায়ে জারিয়া বা প্রবাহমান ও চলমান সাদাকা প্রদান করা। যেমন পানির  কুপ খনন করা, নলকুপ বসানো, দ্বীনী মাদরাসা প্রতিষ্ঠা, কুরআন শিক্ষার জন্য  মক্তব ও প্রতিষ্ঠান তৈরী করা, স্থায়ী জনকল্যাণমূলক কাজ করা। ইত্যাদি।
(৩) মা-বাবার পক্ষ থেকে রোযা পালনঃমা-বাবা  জীবিত থাকা অবস্থায় যদি তাদের কোন মানতের রোযা কাযা থাকে, সন্তান তাদের পক্ষ থেকে রোযা পালন করলে তাদের পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে। আয়েশা  রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘‘যে ব্যক্তি মৃত্যু বরণ করল এমতাবস্থায় যে তার উপর  রোযা ওয়াজিব ছিল। তবে তার পক্ষ থেকে তার ওয়ারিসগণ রোযা রাখবে’’ [সহীহ  বুখারী:১৯৫২]।
অধিকাংশ আলেমগণ এ হাদীসটি শুধুমাত্র ওয়াজিব  রোযা বা মানতের রোযার বিধান হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তাদের পক্ষ থেকে নফল রোযা রাখার পক্ষে দলীল নাই।
(৪) মৃত বাবা-মায়ের পক্ষ থেকে হজ্জ পালন করাঃ মৃত বাবা-মায়ের পক্ষ থেকে হজ্জ পালন করলে তা আদায় হবে এবং মৃত ব্যক্তি উপকৃত হবে। মৃত ব্যক্তির নামে হজ্জ করার দলীল হলোঃহযরত  আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) হতে বর্ণিত-- তিনি বলেন, জুহাইনা গোত্রের  একজন মহিলা রাসূল (সাঃ) এর কাছে আগমণ করে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমার মা হজ্জ করার মানত করেছিলেন কিন্তু তিনি হজ্জ সম্পদন না করেই মৃত্যু বরণ করেছেন। এখন আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করতে পারি? রাসূল (সাঃ) বললেন,  “তুমি তোমার মায়ের পক্ষ থেকে হজ্জ কর। তোমার কি ধারনা যদি তোমার মার উপর  ঋণ থাকতো তবে কি তুমি তা পরিশোধ করতে না? সে বলল, অবশ্যই পরিশোধ করতাম।  রাসূল (সাঃ) বললেন, তাহলে উহা আদায় কর। কেননা আল্লাহর দাবী পরিশোধ করার  অধিক উপযোগী।” [সহীহ বুখারী: ১৮৫২] । তবে মা-বাবার পক্ষ থেকে যে লোক হজ্জ বা ওমরাহ করতে চায়, তার জন্য শর্ত হলো সে আগে নিজের হজ্জ-ওমরাহ করতে হবে।
(৫) মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী করাঃ মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী করলে তার সাওয়াব দ্বারা মৃত ব্যক্তি উপকৃত হওয়ার পক্ষে সহীহ হাদীস রয়েছেঃহযরত  আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সাঃ) এমন একটি দুম্বা উপস্থিত করতে বললেন, যার পা কালো, চোখের চতুর্দিক কালো এবং পেট কালো। অতঃপর তা  কুরবানীর জন্য আনা হলো। তখন রাসূল (সাঃ) আয়েশা (রাঃ) কে বললেন, ছুরী এনে  পাথর দ্বারা ধারালো কর। তিনি তাই করলেন। তারপর রাসূল (সাঃ) ছুরী হাতে নিয়ে  দুম্বাটিকে শুয়াইয়ে দিলেন। পশুটি যবেহ্ করার সময় বললেন, বিসমিল্লাহ, হে  আল্লাহ! তুমি ইহা মুহাম্মাদ, তাঁর বংশধর এবং সকল উম্মাতে মুহাম্মাদীর পক্ষ থেকে কবুল কর। [ সহীহ মুসলিম:৫২০৩] ।
অন্য হাদীসে বলা  হয়েছে, রাসূল (সাঃ) একটি দুম্বা কুরবানী দিলেন এবং জবাই করার সময় বললেন,  ইহা আমার উম্মাতের ঐসকল লোকদের পক্ষ থেকে, যারা কুরবানী করতে পারে নাই।  (তিরমিযী)
উপরের হাদীস দু‘টির মাধ্যমে জানা গেল যে, কেহ  যদি তার মৃত মাতা-পিতা বা অন্য কোন আত্মীয়ের পক্ষ থেকে কুরবানী করে তবে তা  বৈধ হবে। এমন কি নিজের কুরবানীতে যদি মৃত পিতা-মাত ও পরিবারের সদস্যদেরকে  শামিল রেখে এভাবে নিয়ত করে যে, হে আল্লাহ! আমার এই করুবানী আমার পক্ষ হতে  এবং আমার পরিবারের জীবিত ও মৃত সকল আত্মীয়ের পক্ষ হতে কবুল করুন, তাতেও মৃত  ব্যক্তিগণ সাওয়াব পাবেন।
(৬) মৃত বাবা-মায়ের অসিয়ত পূর্ণ করাঃ মা-বাবা  শরীয়াহসম্মত কোন অসিয়ত করে গেলে তা পূর্ণ করা সন্তানদের উপর দায়িত্ব। হযরত রাশীদ ইবন সুয়াইদ আসসাকাফী (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম - হে আল্লাহর রাসুল, আমার মা একজন দাসমুক্ত করার  জন্য ওসিয়ত করে গেছেন। আর আমার নিকট কালো একজন দাসী আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে ডাকো, সে আসল, রাসূলুল্লাহ  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে প্রশ্ন করলেন, তোমার রব কে ? উত্তরে  সে বলল, আমার রব আল্লাহ। আবার প্রশ্ন করলেন আমি কে ? উত্তরে সে বলল, আপনি  আল্লাহর রাসুল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,  তাকে মুক্ত করে দাও; কেন না সে মু’মিনা [সহীহ ইবন হিববান :১৮৯]
(৭) মৃত মা-বাবার বন্ধুদের সম্মান করাঃ মা-বাবার  বন্ধুদের সাথে ভাল ব্যবহার করা, সম্মান করা, তাদেরকে দেখতে যাওয়া,তাদেরকে  হাদিয়া দেয়া। এ বিষয়ে হাদীসে উল্লেখ আছে, আব্দুল্লাহ ইবনে দীনার হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, একবার মক্কার পথে চলার সময়  আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু এর এক বেদুঈন এর সাথে দেখা হলে তিনি তাকে  সালাম দিলেন এবং তাকে সে গাধায় চড়ালেন যে গাধায় আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা উপবিষ্ট ছিলেন এবং তাঁর (আব্দুল্লাহ) মাথায় যে পাগড়িটি পরা ছিলো তা  তাকে প্রদান করলেন। আব্দুল্লাহ ইবান দীনার বললেন, তখন আমরা আব্দুল্লাহকে বললাম: হে ইবনে উমর, আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুক! এরা গ্রাম্য মানুষ: সামান্য  কিছু পেলেই এরা সন্তুষ্ট হয়ে যায়-(এতসব করার কি প্রয়োজন ছিলো?) উত্তরে  আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তার পিতা, (আমার পিতা) উমর  ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু এর বন্ধু ছিলেন। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি “পুত্রের জন্য পিতার  বন্ধু-বান্ধবের সাথে ভাল ব্যবহার করা সবচেয়ে বড় সওয়াবের কাজ’’ [সহীহ  মুসলিম:৬৬৭৭]।
মৃতদের বন্ধুদের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আমলও আমাদেরকে উৎসাহিত করে। আয়েশা  রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই কোন বকরী যবেহ করতেন, তখনই তিনি বলতেন, এর কিছু অংশ  খাদীজার বান্ধবীদের নিকট পাঠিয়ে দাও [সহীহ মুসলিম: ৬৪৩১]
(৮) মা-বাবার আত্নীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখাঃ সন্তান  তার মা-বাবার আত্নীয়দের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখবে। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার পিতার সাথে কবরে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা  করতে ভালবাসে, সে যেন পিতার মৃত্যুর পর তার ভাইদের সাথে সু-সম্পর্ক রাখে’  [সহীহ ইবন হিববান:৪৩২]
(৯) ঋণ পরিশোধ করাঃ মা-বাবার কোন ঋণ থাকলে তা দ্রুত পরিশোধ করা সন্তানদের উপর বিশেষভাবে কর্তব্য।  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋণের পরিশোধ করার বিষয়ে বিশেষ  গুরুত্ব দিয়েছেন। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত হাদীসে  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘মুমিন ব্যক্তির  আত্মা তার ঋণের সাথে সম্পৃক্ত থেকে যায়; যতক্ষণ তা তা তার পক্ষ থেকে পরিশোধ  করা হয়”। [সুনান ইবন মাজাহ:২৪১৩]ঋণ পরিশোধ না করার কারণে জান্নাতের  যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়; এমনকি যদি আল্লাহর রাস্তায় শহীদও হয়। হাদীসে আরো এসেছে, 'যতক্ষণ পর্যন্ত বান্দার ঋণ পরিশোধ না করা হবে ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।' [নাসায়ী ৭/৩১৪; তাবরানী ফিল কাবীর ১৯/২৪৮;  মুস্তাদরাকে হাকিম ২/২৯]
(১০) ক্ষমা প্রার্থনা করাঃ মা-বাবার জন্য আল্লাহর নিকট বেশী বেশী ক্ষমা প্রার্থনা করা গুরুত্বপূর্ণ আমল। সন্তান মা-বাবার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করায় আল্লাহ তা‘আলা তাদের মর্যাদা  বৃদ্ধি করে দেন। হাদীসে বলা হয়েছে, হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মৃত্যুর পর কোন বান্দাহর মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়। তখন সে বলে হে আমার রব, আমি তো এতো মর্যাদার আমল করিনি, কীভাবে এ আমল আসলো ?  তখন বলা হবে, তোমার সন্তান তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করায় এ মর্যাদা তুমি পেয়েছো’’ [আল-আদাবুল মুফরাদ:৩৬]।
মা-বাবা দুনিয়া থেকে  বিদায় নেয়ার পর তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার বিষয়ে উসমান রাদিয়াল্লাহু  আনহু বর্ণিত হাদীসে এসেছে, হযরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন এক মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার পর তার কবরের পার্শ্বে দাঁড়ালেন এবং বললেন ‘‘তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য আল্লাহর  কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তার জন্য ঈমানের উপর অবিচলতা ও দৃঢ়তা কামনা  কর, কেননা এখনই তাকে প্রশ্ন করা হবে’’ [মুসনাদুল বাজ্জার :৪৪৫]।
(১১) মা-বাবার ভাল কাজসমূহ বহাল রাখাঃমা-বাবা  যেসব ভাল কাজ অর্থাৎ মসজিদ তৈরী করা, মাদরাসা তৈরী করা, দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরীসহ যে কাজগুলো করে গিয়েছেন সন্তান হিসাবে তা যাতে অব্যাহত  থাকে তার ব্যবস্থা করা। কেননা এসব ভাল কাজের সওয়াব তাদের আমলনামায় যুক্ত  হতে থাকে। হাদীসে এসেছে, ‘‘ভাল কাজের পথপ্রদর্শনকারী এ কাজ সম্পাদনকারীর  অনুরূপ সাওয়াব পাবে’’। [তিরমীযি : ২৬৭০]
আরও এসেছে, "যে  ব্যক্তির ইসলামের ভাল কাজ শুরু করল, সে এ কাজ সম্পাদনকারীর অনুরূপ সাওয়াব পাবে। অথচ তাদেও সওয়াব থেকে কোন কমতি হবে না’’ [সহীহ মুসলিম:২৩৯৮]।
(১২) কোন গুনাহের কাজ করে গেলে তা বন্ধ করাঃ মা-বাবা  বেচে থাকতে কোন গুনাহের কাজের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকলে তা বন্ধ করবে বা  শরীয়াহ সম্মতভাবে সংশোধন করে দিবে। কেননা আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু  হতে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যে  মানুষকে গুনাহের দিকে আহবান করবে, এ কাজ সম্পাদনকারীর অনুরূপ গুনাহ তার আমলনামায় যুক্ত হতে থাকবে। অথচ তাদের গুনাহ থেকে কোন কমতি হবে না’’ [সহীহ  মুসলিম:৬৯৮০]।
(১৩) মা-বাবার পক্ষ থেকে মাফ চাওয়াঃ মা-বাবা  বেচে থাকতে কারো সাথে খারাপ আচরণ করে থাকলে বা কারো উপর যুলুম করে থাকলে  বা কাওকে কষ্ট দিয়ে থাকলে মা-বাবার পক্ষ থেকে তার কাছ থেকে মাফ মাফ চেয়ে  নিবে অথবা ক্ষতি পূরণ দিয়ে দিবে। কেননা হাদীসে এসেছে, হযরত আবু হুরায়রা  রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া  সাল্লাম বলেছেন, তোমরা কি জান নিঃস্ব ব্যক্তি কে? সাহাবীগণ বললেন, আমাদের  মধ্যে যার সম্পদ নাই সে হলো গরীব লোক। তখন তিনি বললেন, আমার উম্মতের মধ্যে  সে হলো গরীব যে, কিয়ামতের দিন নামায, রোযা ও যাকাত নিয়ে আসবে অথচ সে অমুককে  গালি দিয়েছে, অমুককে অপবাদ দিয়েছে, অন্যায়ভাবে লোকের মাল খেয়েছে, সে লোকের রক্ত প্রবাহিত করেছে এবং কাউকে প্রহার করেছে। কাজেই এসব নির্যাতিত  ব্যক্তিদেরকে সেদিন তার নেক আমল নামা দিয়ে দেয়া হবে। এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। [তিরমিযি :২৪২৮]
সুতরাং এ ধরনের নিঃস্ব ব্যক্তিকে মুক্ত করার জন্য তার হকদারদের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেয়া সন্তানের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।
...পরম করুণাময় এবং সর্বজ্ঞানী অল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে মৃত মা-বাবার জন্য আমলগুলো করার তাওফীক দিন।আমীন!


Wednesday, November 20, 2019

HTML Templete



খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত বা মজুদকারীর শাস্তি কি? অথবা পরিনাম কি?


মা‘মার বিন ‘আবদিল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেনঃ খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত কেবল (সমাজ বিরোধী) পাপী লোকেরাই করে থাকে। [৮৬৬]
ফুটনোটঃ
[৮৬৬] মুসলিম ১৬০৫, তিরমিযী ১২৬৭, আবূ দাউদ ৩৪৪৭, ইবনু মাজাহ ২১৫৪, আহমাদ ১৫৩৩১, ১৫৩৩৪, দারেমী ২৫৪৫। মুসলিমের অপর এক বর্ণনায় রয়েছে, (আরবী) অর্থাৎ যে গুদামজাত করে সেই পাপী (সমাজবিরোধী)।
বুলুগুল মারাম, হাদিস নং ৮১৩
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস

মা’মার ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু নাযলাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছিঃ “শুধুমাত্র দুর্নীতিপরায়ণ মানুষই মজুতদারি করে থাকে”। আমি (মুহাম্মাদ ইবনু ইবরাহীম) সাঈদকে বললাম, হে মুহাম্মাদের পিতা! আপনিও তো মজুতদারি করে থাকেন। তিনি বললেন, মজুতদারি তো মা’মারও করতেন।
সহীহ্‌, ইবনু মা-জাহ (২১৫৪), মুসলিম
ফুটনোটঃ
আবূ ঈসা বলেন, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব প্রসঙ্গে বর্ণিত আছে যে, তিনি তেল, গম ও এই জাতীয় জিনিস মজুত করতেন।
উমার, আলী, আবূ উমামা ও ইবনু উমার (রাঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। মা’মার (রাঃ) বর্ণিত হাদীসটি হাসান সহীহ্‌। এ হাদীস মোতাবিক আলিমগণ আমল করেছেন। খাদ্যদ্রব্যের মজুতদারি করাকে তারা মাকরূহ বলেছেন। খাদ্যদ্রব্য ব্যতীত অন্য কিছুর মজুতদারি করার পক্ষে কিছু সংখ্যক আলিম অনুমতি দিয়েছেন। ইবনুল মুবারাক বলেছেন, তুলা, ছাগলের চামড়া বা ঐ ধরণের অন্য কিছুর মজুতদারি করাতে কোন সমস্যা নেই।
জামে' আত-তিরমিজি, হাদিস নং ১২৬৭
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস

‘আদী ইবনু কা’বের(রাঃ) এক পুত্র মা‘মার ইবনু আবু মা‘মার (রাঃ) সুত্র থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, রাসুলাল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ জঘন্য অপরাধী ছাড়া কেউই নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি (মূল্য বৃদ্ধির আশায়) গুদামজাত করে না। আমি (মুহাম্মাদ ইবনু ‘আমর) সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব (রহঃ) -কে বলি, আপনি তো গুদামজাত করেন। তিনি বলেন, মা‘মারও গুদামজাত করতেন। ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ) বলেন, আমি আহমাদ ইবনু হাম্বল (রহঃ) কে জিজ্ঞাসা করলাম, (কোন বস্তু) গুদামজাত করা নিষেধ? তিনি বললেন, মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় বস্তু। ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ) বলেন, আওযাঈ‘ (রহঃ) বললেন, গুদামজাতকারী হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে বাজারজাত করার পথে প্রতিবন্ধক হয়।
সহীহঃ ইবনূ মাজাহ (২১৫৪)।
সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৩৪৪৭
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস

মা’মার বিন আবদুল্লাহ বিন নাদলা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ পাপিষ্ঠ ব্যক্তি ছাড়া কেউ মজুতদারি করেনা। [২১৫৪]
ফুটনোটঃ
[২১৫৪] মুসলিম ১৬০৫, তিরমিযী ১২৬৭ আবূ দাউদ ৩৪৪৭, আহমাদ ১৫৩৩১, ২৬৭০৩, দারেমী ২৫৪৩। তাহকীক আলবানীঃ সহীহ। উক্ত হাদিসের রাবী মুহাম্মাদ বিন ইসহাক সম্পর্কে ইয়াহইয়া বিন মাঈন ও আজালী বলেন, তিনি সিকাহ। আহমাদ বিন হাম্বল বলেন, তিনি হাসানুল হাদিস। আলী ইবনুল মাদীনী বলেন, তিনি সালিহ। সুলায়মান বিন তারখান ও সুলায়মান বিন মিহরান বলেন, তিনি মিথ্যুক। আবু হাতিম আর-রাযী বলেন, তিনি আমার নিকট হাদিস বর্ণনায় নির্ভরযোগ্য নয়, তিনি হাদিস বর্ণনায় দুর্বল। (তাহযীবুল কামালঃ রাবী নং ৫০৫৭, ২৪/৪০৫ নং পৃষ্ঠা)
সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২১৫৪
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস

Saturday, November 16, 2019

নাস্তিকতা একটি বিশ্বাস এবং ধর্ম ।

বিষয়ঃ নাস্তিকতা একটি বিশ্বাস এবং ধর্ম ।
আমরা সবাই জানি ধর্ম শব্দের শাব্দিক অর্থ হল ধারন করা । আপনি যা ধারন করবেন সেটাই হবে আপনার ধর্ম । নাস্তিক্য মতবাদ বা বিশ্বাস যে নাস্তিকরা বিশ্বাস করে বা ধারন করে এই ক্ষেত্রে নাস্তিকতাও একটি ধর্ম প্রমানিত হচ্ছে । যদি কেউ বলে যে নাস্তিকতা কোন ধর্ম না । এরমানে দাড়ায় নাস্তিকতাকে তারা ধারন করে না , যেহেতু তারা নাস্তিকতাকে ধারন করে না তাহলে কিভাবে তারা নাস্তিক হয় ? আমার বুঝে আসে না । নাস্তিক অনুসারীরা স্বীকার করতে চায় না যে "নাস্তিকতাও একটি ধর্ম" কারন একে ধর্ম বলে স্বীকার করলে তাদের এই লুলা মতবাদের যে বেহাল দশা সেটি বিবেকবান মানুষ সহজেই বুঝে যাবে এবং এই নাস্তিক ধর্মে যে যুক্তি আর বিজ্ঞানের নাম করে মানুষকে ভ্যাজাল বয়ান শুনিয়ে আসছে সেটি চিন্তাশীল মানুষ স্পষ্ট করেই বুঝে যাবে তাই তারা একে ধর্ম বলে স্বীকার করতে চায় না।
সুতরাং যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গিঃ ধর্ম মানে ধারন করা - নাস্তিকতা নাস্তিকরা ধারন করে - সুতরাং নাস্তিকতা একটি ধর্ম । যদি এর বিপরীত হয় যেমন ধর্ম মানে ধারন করা , নাস্তিকতা কোন ধর্ম না তাহলে নাস্তিকরা যেহেতু তাদের নাস্তিকতাকেই অবিশ্বাস করে সুতরাং নাস্তিকদের কাছেই নাস্তিকতা মূল্যহীন । আমাদেরকে কেন নাস্তিক ধর্মের দাওয়াত দেন খগেন হুজুর ?
বিশ্বাস বলতে কি বুঝি। বিশ্বাস হচ্ছে পৃথিবীর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার কেউ যদি বলে আমি বিশ্বাসে বিশ্বাসী না তাকে হয়ত মানসিক রোগের ডাক্তার দেখানো উচিত। কারণ বিশ্বাস হচ্ছে একটি মৌলিক ভিত্তি৷ ঈশ্বরে বিশ্বাসটা আরও গভীর একেবারে জীবনের সূচনালগ্নের সাথে সম্পৃক্ত, এক জন্মগত ফিতরাহ। একে ইনিয়ে বিনিয়ে বিকৃত করে নানা মতবাদ দাড় করানো যায়, অবশ্যই যায়। ঠিক এইরকম মতবাদই দাড় করানো হয়েছে যাকে মুক্তমনারা নাম দিয়েছেন নাস্তিক্যবাদ৷
যাদের মূল স্লোগান টাই হল " There is no god " যার মৌলিক বিষয় হল বিশ্বাসে অবিশ্বাসী হওয়া। যদিও তা দাবীমাত্র, হ্যা আসলেই দাবী যা এই অধ্যায়টাতেই প্রকাশ করব ইন শা আল্লাহ। আমরা যদি সেকুলারিজম এবং নাস্তিক্যবাদ নিয়ে কিছু পড়াশোনা করি তাহলে আমরা সকলেই বুঝতে পারবো যে, এটি এমন এক মতবাদ যেটি নিজেও " বিশ্বাসে " টিকে আছে যাকে আরেকটা ধর্মই বলা যায়।
আমি এই অধ্যায়টিতে নাস্তিক্যবাদের ধর্ম নিয়ে আলোচনা করব নাস্তিক্যবাদের শাখা ডারউইনীয় ধর্ম। যা আমি নয় বরং গোড়া বিবর্তনবাদী নাস্তিক বিজ্ঞানীরাই বলেছেন। তার আগে একটু ইতিহাস দেখে নেয়া যাক।
নাস্তিক সন্ত্রাসী লেলিনের মৃত্যুর ৫ পর ১৯২৯ সালে নাস্তিকতাকে রাজকীয় ধর্ম হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় এবং নাস্তিক লীগকে নিজের মত করে প্রচার করার জন্য একচেটিয়া অধিকার দিয়ে রাজফরমান জারি করা হয় সোভিয়েত ইউনিয়নে [১] ।
এবার আসি মূল আলোচনায়। Francis Collins যিনি U.S. National Institutes of Health [২] এর ডিরেক্টর এবং এর পাশাপাশি তিনি একজন নামকরা বিজ্ঞানী যিনি Human Genom সম্পর্কে অনেক গবেষণা করেছেন তিনি বলেন,
" দেখুন এখানে কোন বৈপরীত্যই নেই ঈশ্বরে বিশ্বাসে এবং সমসাময়িক বিবর্তনবাদকে মেনে নেওয়ায়। "
সমসাময়িক American Association for the Advancement of Science নামক প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত পেপারেও এই কথাটি এসেছে [৩] ৷
অক্সফোর্ড প্রেস থেকে Michale Ruse তার একটি বই প্রকাশ করেন যার নামই ছিল " Darwinism as Religion " [৪]।
আপনি হয়ত বলতে পারেন যে, এরসাথে নাস্তিকতার সম্পর্ক কি? বিবর্তনবাদ ধর্ম এর মত থাকুক বা যাই থাকুক এতে নাস্তিকতার সম্পর্ক কি? এক্ষেত্রে আমি বলব জ্বি অবশ্যই সম্পর্ক আছে। আর সম্পর্ক টা হল নাস্তিকরা বিবর্তনবাদকে যেভাবে প্রচার করেন যে এটি আসলে কোন ফ্যাক্ট হয়ে গেছে। অনেকটা ধর্মের মতই করে থাকেন।
এই কথাটি আমি নয় বরং খোদ বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানীই বলেছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর Michale Ruse বলেন, [৫]।
" বিবর্তনবাদকে এর চর্চাকারীরা শুধু বিজ্ঞান নয় বরং এর চেয়ে ভেশি কিছু হিসেবে প্রচার করছে। বিবর্তনবাদ ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে একটি ভাবাদর্শ, একটি সেকুলার ধর্ম হিসেবে... আমি একজন অত্যন্ত গোড়া বিবর্তনবাদী কিন্তু তা সত্ত্বেও আমাকে স্বীকার করতেই হবে বিবর্তনবাদ একটি ধর্ম। একথা বিবর্তনবাদের শুরুতে যেমন প্রযোজ্য ছিল এখনো সেরকমই আছে।
এছাড়া Robert H. Nelson [৬] এক জার্নালে সেকুলারিজমকে " ধর্মনিরপেক্ষ ধর্ম নিরপেক্ষ নয় " বলে আখ্যায়িত করেছেন। নিচে সম্পুর্ন উদ্ধৃতিটি দেয়া হল
" সেকুলারিজম ধর্মের বিপরীত হওয়ার চেয়ে এটি নিজেকে একটি উহ্য ধর্ম হিসেবে প্রকাশ করে যা পূর্বের প্রভাবশালী ধর্মগুলোর ঐতিহ্য বহন করে বিভিন্ন সমাজভেদে। যেমন এক সময় খ্রিষ্টান ধর্মের ঐতিহ্য গুলো প্রভাব বিস্তার করতো। যেমন সেকুলার প্রোটেস্টেনিজম, ক্যাথলিজম, অর্থডক্সি ইত্যাদি। সেকুলার ধর্ম এখন আর ততটা সেকুলার নাই। যতটা সমাজ বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন। "
এমনকি এককালে সেরা Evolutionary Biologist, Stephen Jay Gould [৭] একাধারে হার্ভার্ড এবং নিউ ইয়োর্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন তিনি এই ডারুইনিজম এবং নাস্তিকতার ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে বলেন,
" হয় আমার অর্ধেক সহকর্মীরা হচ্ছে বেকুব, মূর্খ আর নাইলে ডারউইনিজমের বিজ্ঞান, যা পুরোপুরিভাবে ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং নাস্তিকতার সাথে এর সামঞ্জস্যতা পুরোটাই "
নাস্তিকরা দাবী করবে যে নাস্তিক্যবাদের সাথে ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই। এটি ধর্মের বিপরীত। এখানে মূল বিষয় টা হচ্ছে " দাবী " র আপনি কোন কিছু বললেই সেটা প্রমাণিত হয়না। তথাকথিত কিছু জিহাদি সংঘটন তাদের সহীহ ইসলামী বললে যেমন তারা প্রকৃত ইসলামে পরিণত হয়না ঠিক নাস্তিকদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এরকমই। তারা হয়ত ঈশ্বরকে ভুলে গিয়েছে ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাসের অভাবে। কিন্তু সেই অবিশ্বাসটা কিসের উপর ভিত্তি করে করেছে? উত্তর হচ্ছে বিজ্ঞানের উপর বা দর্শনের উপর তাই না ? আমি যদি বলি বিজ্ঞান নিজেই এই ধরণের বিষয়াদি তে বিশ্বাস করেনা সেক্ষেত্রে কি হবে? হ্যা ব্যাপারটা সেরকমই
বিজ্ঞানী Ken Wilber [৮] যিনি উনার Integral Theory র জন্য বেশ জনপ্রিয় তিনি বলেন,
" তাদের জন্য যারা পদার্থবিজ্ঞান কে ধর্ম হিসেবে মেনে নিয়ে মাথা নত করছেন। আমি জিজ্ঞাস করতে চাই তাদের, এটির অর্থ কি ? আধুনিক বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা, তাত্ত্বিকরা যেসকল ধারণা (Theory) প্রবর্তন করেছেন যার পুজো আপনি করছেন, অথচ সেগুলোর প্রত্যেকটিই রহস্য। "
ব্যাপারটা এখানেই শেষ করা যায়না। শুধুমাত্র ডারউইনীয় ধর্ম ই নাস্তিক্যবাদের একটি ধর্মীয় শাখা নয় বরং সেকুলারিজম কিংবা সেকুলার হিউম্যানিজম এগুলোও অনেকটা ধর্মের মত।
পশ্চিমা জনপ্রিয় একটি সাইন্টিফিক ম্যাগাজিনের [৯] শিরোনাম ছিল " Is Secular Humanism a Religion? " এছাড়া ২০০৬ সালে BBC কর্তৃক [১০] একটি অনুষ্টানের আয়োজন করা হয় যার শিরোনাম ছিল " The Trouble with Atheism " যেখানে তারা বলেন যে নাস্তিকরাও একপ্রকার ধার্মিক।
নিউ সাইন্টিস্ট ম্যাগাজিনে Nonreligion and Secularity Research Network at the University of Kent in Canterbury, UK এর পরিচালক Lois Lee [১১] বলেন,
" যখন মানুষ বলে নাস্তিকতা একটি ধর্ম তখন তারা তাদের এই ভাবটি অনেকটা মানহানিকর পন্থায় প্রকাশ করে। কিন্তু এখানে একটি বিষয় পরিস্কার আর তা হল নাস্তিকরা ভন্ড, দ্বিমুখী। "
নাস্তিকতা যে একটি ধর্ম হতে পারে এর আরেকটি বড় প্রমান হল বৌদ্ধ ধর্ম । বৌদ্ধ ধর্মে স্রষ্টায় অস্বীকার করা হয় এবং মানা হয় সব কিছু যুক্তি দিয়েই সমাধান করতে হবে (১২)
উইকিপিডিয়ায় "সোভিয়েত ইউনিয়ন" বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে । এবং সেখানে রাষ্ট্রীয় ধর্ম নাস্তিক্যবাদ উল্লেখ করা হয়েছে । (১৩)
ভ্লাদিমির লেনিন এর ধর্ম ছিল নাস্তিকতা । (১৪)
"Religion in Russia" তে "Atheists" কে ধর্মের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। (১৫)
"ENCYCLOPÆDIA BRITANNICA" তেও অন্য ধর্মের মধ্যে নাস্তিকতাকেও অ্যাড করা হয়েছে । দেখুন "Religious affiliation 2005" চার্টে অন্য ধর্মের সংখ্যা বর্ণনা করতে গিয়ে "নাস্তিক ধর্মের" সংখ্যা সবুজ রং দিয়ে দেখানো হয়েছে । (১৬)
ধর্মের বিষয় কি? ধর্মের মৌলিক বিষয়ই হল " বিশ্বাস "। যেই বিশ্বকসের প্রতিই নাস্তিকরা তাদের অবিশ্বাস ব্যক্ত করে। কিন্তু কোন বিশ্বাসকে বাদ দিয়ে সেই বিশ্বাসের বিরোধীতা করা অন্য কোন জিনিসের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে। সেটা কতখানি যৌক্তিক? মোটেও এটি কখনো যৌক্তিক হবেইনা বরং উক্ত বিশ্বাসটি জন্মগত বিশ্বাস হলে সেক্ষেত্রে সেটি অযৌক্তিকতার পাল্লাকে ভারী করে।
পরিশেষে কিছু প্রশ্নঃ
১/ যেসব নাস্তিকরা বলেন নাস্তিকতা কোন ধর্ম না , আপনারা কি নাস্তিকতাকে ধারন করেন না ?
২/ আপনারা কি বিশ্বাস করেন না যে "স্রষ্টা নেই" ?
৩/ আপনারা কি বিশ্বাস করেন না যে বিবর্তনবাদ সঠিক ?
৪/ আপনারা কি বিশ্বাস করেন না যে নাস্তিকতাই মানব ধর্ম ?
৫/ আপনারা কি বিশ্বাস করেন না যে "শুন্য থেকে সব এসেছে" ?
রেফারেন্স সমূহঃ
১. Pan Islamism and Bolshevism pp.416 - 417
২. Francis Collins - [ https://www.nih.gov/…/biographical-sketch-francis-s-collins… ]
৩. American Association for the Advancement of Science AAAS paper pdf - [ https://www.aaas.org/sites/default/files/QA_Evolution_0.pdf ]
৪. Darwinism as Religion by Michale Ruse - [ https://global.oup.com/…/darwinism-as-religion-978019024102…& ]
৫. https://www.google.com/…/s/m.huffpost.c…/us/entry/904828/amp
৬. Robert H. Nelson, "The Secularization Myth Revisited: Secularism as Christianity in Disguise,"Journal of Markets & Morality 18, no. 2 (Fall 2015): 279-308. Pdf link - [ http://www.marketsandmorality.com/…/m…/article/view/1095/957 ]
৭. Stephen Jay Gould, 'Impeaching a Self-appointed Judge', Scientific American 267, No.1, 1992, pp.118-121
৮. Ken Wilber, Quantum Questions (Boston: Shambhala, 2001), pp.ix-xii (his emphasis)
৯. Is Secular Humanism a Religion? - [ https://quillette.com/…/…/11/is-secular-humanism-a-religion/ ]
১০. The Trouble with Atheism - [ https://www.youtube.com/watch?v=g6MrktRKfJU ]
১১. Faith of the faithless: Is atheism just another religion? - [ https://www.google.com/…/mg23431212-800-faith-of-the-f…/amp/ ]

লিখেছেনঃ আফিফ আলী সাদাফ

Thursday, November 14, 2019

মিলাদুন্নবী সম্পর্কে ইবন্র তাইমিয়া রঃ এর মত

মীলাদুন্নবী সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়া রহ. এর মতামত: একটি সংশয় নিরসন
_________________
মীলাদুন্নবী সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর মতামত কি -- এ বিষয়ে সৌদী আরবের প্রসিদ্ধ আলেম শায়খ শরীফ হাতিম আল-আওনী (হাফি.) এর একটি লেখা দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এই লেখাটির উদ্ধৃতি দিয়ে কিছু ভাইকে দেখলাম সোশ্যাল মিডিয়ায় ইবনে তাইমিয়ার নামে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। এর দায় অবশ্য শায়খ হাতিম আল-আওনীর ওই লেখার উপর বেশী বর্তায়। এদেশের যারা এই বিভ্রান্তির শিকার হয়েছেন তাদের সমস্যা হচ্ছে, তারা ইবনে তাইমিয়ার মূল কিতাবাদি পড়ে তাঁর মতামত না জেনে একজন শায়খের উদ্ধৃতির উপর ভরসা করেছেন।
মূল প্রসঙ্গে যাওয়ার পূর্বে ভূমিকাস্বরুপ একটি কথা বলতে চাই। আরবী পরিভাষায় 'তাজযিয়াতুন নুসুস' বলে একটি কথা আছে। এর অর্থ হচ্ছে, কারো কোন বক্তব্যকে কাটছাঁট করে নিজের পছন্দমতো স্থান উল্লেখ করা। এটা যে সবসময় ইচ্ছেকৃতভাবে এবং অসৎ উদ্দেশ্যে হয় সেটা নয়। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, উক্ত বিষয়ে ব্যাক্তিটির অপর্যাপ্ত জানাশোনা দায়ী থাকে। সব রেফারেন্স ঘেঁটে কোন বিষয়ে কারো পূর্নাঙ্গ বক্তব্য দাঁড় করাতে তিনি সক্ষম হননি। ফলে কারো নির্দিষ্ট একটি কথা কোট করে তার উপর একটি হুকুম লাগিয়ে দেন। এভাবেই বিভ্রান্তি ছড়ায়। আবার কেউ কাজটা অসৎ উদ্দেশ্যেও করে থাকে। ইচ্ছে করে কারো খন্ডিত বক্তব্য উল্লেখ করে তার সম্পর্কে একটা ভুল ধারণা প্রচার করে।
এই ব্যাপারটা কেবল কোন ইমাম কিংবা আলিমের ক্ষেত্রেই নয়; বরং কোরআন এবং হাদীসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কোরআন এবং হাদীসের এমন কিছু উদ্ধৃতি পাওয়া যায়, যেগুলোকে খালি চোখে দেখলে পরষ্পর বিরোধী মনে হয়। এসব ক্ষেত্রে বৈপরীত্যটা কেবল বাহ্যিকভাবে দেখা যায়। প্রকৃতপক্ষে কোন বৈপরীত্য থাকে না। কোরআন এবং হাদীসের ব্যাখ্যাকারগণ দলিল প্রমানের ভিত্তিতে বিশদ আলোচনার মাধ্যমে এগুলোর মধ্যে বিভিন্নভাবে সামঞ্জস্য বিধান করে থাকেন। এ বিষয়ে 'মুখতালাফুল হাদীস' নামে আলাদা একটি শাস্ত্রেরও গোড়াপত্তন করা হয়েছে এবং এই বিষয়ে প্রচুর কিতাবাদিও লেখা হয়েছে। এখন কেউ যদি এই ধরণের কোন বিষয়ে নির্দিষ্ট একটি বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে সেটাকে ইসলামের অবস্থানরুপে দেখাতে চায় তাহলে সেটা নিশ্চিতভাবেই ভুল কাজ হবে।
এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক। শায়খ শরীফ হাতিম আল-আওনী আমার উস্তাদ। নিয়মতি উস্তাদ না, তবে তাঁর দরসে বসার সুযোগ আমার হয়েছে। তাঁর সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আমার কথাও হয়েছে। একটি সেলফীও তোলা আছে। কেউ চাইলে মেসেঞ্জারে দেবো। ইলমে হাদীস বিষয়ে তাঁর কিতাবাদিকে আমি গুরুত্বের সাথে পড়ি। তিনি আমাদের শায়খ, খাতিমাতুল মুহাদ্দিসীন, ডক্টর আহমাদ মা'বাদ আব্দুল কারীমের ছাত্র। ডক্টর আহমাদ মা'বাদ শায়খ হাতিম আল-আওনীকে পছন্দও করেন। আযহারের হাদীসী সেমিনারগুলোতে তাঁকে নিয়মিত দাওয়াত দেন।
এই কথাগুলো বলার কারণ হচ্ছে, শায়খ হাতিম আল-আওনীর ব্যাপারে আমার জানাশোনা এবং তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধার ব্যাপারটা বোঝানো।
শায়খ শরীফ হাতিমের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি যে, তিনি ইবনে তাইমিয়া রহ. এর মীলাদ সংক্রান্ত উদ্ধৃতির ক্ষেত্রে ইবনে তাইমিয়ার পূর্নাঙ্গ বক্তব্য উল্লেখ করেন নি। এ বিষয়ে ইবনে তাইমিয়ার মূল ফতওয়া কি সেটাও উল্লেখ করেন নি। যে অংশটি উল্লেখ করেছেন সেটাকেও এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যে, এর কারণে পাঠকের মনে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। তিনি যে অর্থে ইবনে তাইমিয়ার কথাটির উদ্ধৃতি দিয়েছেন সে অর্থে ইবনে তাইমিয়া রহ. কথাটি বলেছেন -- এমনটাও প্রমাণিত হয় না। বিষয়টা সামনের আলোচনায় স্পষ্ট হবে।
মীলাদুন্নবী সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়া রহ. এর মূল ফতোয়া কি?
প্রচলিত মীলাদ সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়া রহ. এর ফতোয়া হচ্ছে, এটা সম্পূর্ণ বিদআত। তাঁকে মাওলিদের রাত সম্পর্কে মাসআলা জিজ্ঞাসা করে হলে তিনি বলেছিলেন:
ﻭَﺃَﻣَّﺎ ﺍﺗِّﺨَﺎﺫُ ﻣَﻮْﺳِﻢٍ ﻏَﻴْﺮِ ﺍﻟْﻤَﻮَﺍﺳِﻢِ ﺍﻟﺸَّﺮْﻋِﻴَّﺔِ ﻛَﺒَﻌْﺾِ ﻟَﻴَﺎﻟِﻲ ﺷَﻬْﺮِ ﺭَﺑِﻴﻊٍ ﺍﻟْﺄَﻭَّﻝِ ﺍﻟَّﺘِﻲ ﻳُﻘَﺎﻝُ : ﺇﻧَّﻬَﺎ ﻟَﻴْﻠَﺔُ ﺍﻟْﻤَﻮْﻟِﺪِ ﺃَﻭْ ﺑَﻌْﺾِ ﻟَﻴَﺎﻟِﻲِ ﺭَﺟَﺐٍ ﺃَﻭْ ﺛَﺎﻣِﻦَ ﻋَﺸَﺮَ ﺫِﻱ ﺍﻟْﺤِﺠَّﺔِ ﺃَﻭْ ﺃَﻭَّﻝِ ﺟُﻤْﻌَﺔٍ ﻣِﻦْ ﺭَﺟَﺐٍ ﺃَﻭْ ﺛَﺎﻣِﻦِ ﺷَﻮَّﺍﻝٍ ﺍﻟَّﺬِﻱ ﻳُﺴَﻤِّﻴﻪِ ﺍﻟْﺠُﻬَّﺎﻝُ ﻋِﻴﺪَ ﺍﻟْﺄَﺑْﺮَﺍﺭِ ﻓَﺈِﻧَّﻬَﺎ ﻣِﻦْ ﺍﻟْﺒِﺪَﻉِ ﺍﻟَّﺘِﻲ ﻟَﻢْ ﻳَﺴْﺘَﺤِﺒَّﻬَﺎ ﺍﻟﺴَّﻠَﻒُ ﻭَﻟَﻢْ ﻳَﻔْﻌَﻠُﻮﻫَﺎ ﻭَﺍَﻟﻠَّﻪُ ﺳُﺒْﺤَﺎﻧَﻪُ ﻭَﺗَﻌَﺎﻟَﻰ ﺃَﻋْﻠَﻢُ .
অর্থাৎ, "শরীয়তের বৈধ দিবস ছাড়া অন্যকোন দিবস যেমন, রবিউল আওয়ালের যে রাতকে 'লাইলাতুল মাওলিদ' বলা হয়, এভাবে রজব মাসের নির্দিষ্ট কোন রাত, জুলহজ্জ মাসের ১৮ তারিখের রাত, রজব মাসের প্রথম জুমার দিন এবং শাওয়াল মাসের দিন যেটাকে অজ্ঞ লোকেরা 'ঈদুল আবরার' বলে -- এগুলো সবই এমন সব বিদআত কর্মকান্ড যেগুলোকে আমাদের সালাফগণ পছন্দ করেন নি এবং পালনও করেন নি। আল্লাহ সর্বজ্ঞানী।" (১)
শায়খ শরীফ হাতিম ইবনে তাইমিয়ার কিতাব 'ইকতিদাউস সিরাতিল মুস্তাকীম'-এর যে জায়গাটার উদ্ধৃতি দিয়েছেন তার ৩ পৃষ্ঠা পূর্বে ইবনে তাইমিয়া রহ. লিখেছেন:
ﻓﺈﻥ ﻫﺬﺍ ﻟﻢ ﻳﻔﻌﻠﻪ ﺍﻟﺴﻠﻒ، ﻣﻊ ﻗﻴﺎﻡ ﺍﻟﻤﻘﺘﻀﻲ ﻟﻪ ﻭﻋﺪﻡ ﺍﻟﻤﺎﻧﻊ ﻣﻨﻪ ﻟﻮ ﻛﺎﻥ ﺧﻴﺮًﺍ . ﻭﻟﻮ ﻛﺎﻥ ﻫﺬﺍ ﺧﻴﺮًﺍ ﻣﺤﻀﺎ، ﺃﻭ ﺭﺍﺟﺤًﺎ ﻟﻜﺎﻥ ﺍﻟﺴﻠﻒ ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻬﻢ ﺃﺣﻖ ﺑﻪ ﻣﻨﺎ، ﻓﺈﻧﻬﻢ ﻛﺎﻧﻮﺍ ﺃﺷﺪ ﻣﺤﺒﺔ ﻟﺮﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻭﺗﻌﻈﻴﻤًﺎ ﻟﻪ ﻣﻨﺎ، ﻭﻫﻢ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﺨﻴﺮ ﺃﺣﺮﺹ .
"এই কাজটা (মওলিদ উদযাপন) সালাফ আলেমদের কেউই করেন নি, এই কাজের প্রতি উৎসাহব্যাঞ্জক কারণ ( ﻣﻘﺘﻀﻲ ) থাকা সত্ত্বেও এবং এর বিরুদ্ধে কোন বাধা (ﻣﺎﻧﻊ) না থাকা সত্ত্বেও। যদি এই কাজটার কল্যানকর হতো অথবা উচিত হতো তাহলে পূর্ববর্তী আলেমগণ এর বেশী হক্বদার ছিলেন। কারণ তারা আমাদের চেয়েও বেশী নবী-প্রেমিক ছিলেন। রাসুলের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও তারা এগিয়েছিলেন এবং উত্তম কাজের ব্যাপারে তারা অধিক সচেতন ছিলেন।" (২)
এর থেকে পষ্ট হয় যে, ইবনে তাইমিয়া রাহ. মীলাদ সংক্রান্ত যাবতীয় অনুষ্ঠানকে স্পষ্ট বিদআত মনে করতেন এবং এর থেকে মুসলমানদেরকে সতর্ক করেছেন।
এছাড়াও ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. যাবতীয় নবআবিষ্কৃত ঈদ, দিবস এবং ইসলাম সংক্রান্ত অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে সাধারণ ফতওয়া প্রদান করতে গিয়ে বলেছেন:
ﺳﺎﺋﺮ ﺍﻷﻋﻴﺎﺩ ﻭﺍﻟﻤﻮﺍﺳﻢ ﺍﻟﻤﺒﺘﺪﻋﺔ ﻣﻦ ﺍﻟﻤﻨﻜﺮﺍﺕ ﺍﻟﻤﻜﺮﻭﻫﺎﺕ ﺳﻮﺍﺀ ﺑﻠﻐﺖ ﺍﻟﻜﺮﺍﻫﺔ ﺍﻟﺘﺤﺮﻳﻢ ﺃﻭ ﻟﻢ ﺗﺒﻠﻐﻪ .
অর্থাৎ, "যাবতীয় নবআবিষ্কৃত ঈদ এবং দিবস (ইসলাম সংক্রান্ত অনুষ্ঠান) নিন্দনীয়, পরিত্যজ্য এবং মাকরুহের অন্তর্ভুক্ত। মাকরুহের স্তরটা হারামের পর্যায়ে পৌঁছুক বা না পৌঁছুক।"(৩)
তিনি অন্যত্র লিখেছেন:
ﻣﺎ ﺃﺣﺪﺙ ﻣﻦ ﺍﻟﻤﻮﺍﺳﻢ ﻭﺍﻷﻋﻴﺎﺩ ﻓﻬﻮ ﻣﻨﻜﺮ ﻭﺇﻥ ﻟﻢ ﻳﻜﻦ ﻓﻴﻪ ﻣﺸﺎﺑﻬﺔ ﻷﻫﻞ ﺍﻟﻜﺘﺎﺏ .
অর্থাৎ, নবআবিষ্কৃত ঈদ এবং দিবসসমূহ মুনকার (পরিত্যজ্য), যদিও সেগুলো আহলে কিতাবের অনুষ্ঠানের সাথে সাদৃশ্য না হয়।(৪)
পূর্বে উল্লেখিত ইবনে তাইমিয়া রহ. এর মিলাদ সংক্রান্ত ফতওয়াগুলোর সাথে পরের দুটি সাধারণ ফতওয়াকে মিলিয়ে দেখলে এ বিষয়টি আরও পষ্ট হয় যে, ইবনে তাইমিয়া রহ. এর সঠিক অবস্থান হচ্ছে, তিনি মীলাদুন্নবির যাবতীয় রুপকে বিদআত মনে করতেন।
শায়খ শরীফ হাতিম আল-আওনীর দাবী:
এবার শায়খ হাতিম আল-আওনী ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর যে কথাটার উদ্ধৃতি দিয়েছেন সেটা দেখা যাক। তিনি বিভিন্ন শর্তসাপেক্ষে মীলাদকে জায়েয প্রমান করতে গিয়ে ইবনে তাইমিয়া রহ. সম্পর্কে লিখেছেন:
ﺑﻞ ﻫﺬﺍ ﺷﻴﺦ ﺍﻹﺳﻼﻡ ﺍﺑﻦ ﺗﻴﻤﻴﺔ ﻓﻲ ﻛﺘﺎﺑﻪ ‏( ﺍﻗﺘﻀﺎﺀ ﺍﻟﺼﺮﺍﻁ ﺍﻟﻤﺴﺘﻘﻴﻢ ‏) ، ﻣﻊ ﺣﻜﻤﻪ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﻤﻮﻟﺪ ﺑﺄﻧﻪ ﺑﺪﻋﺔ؛ ﺇﻻ ﺃﻧﻪ ﻋﺬﺭ ﻣﻘﻴﻤﻴﻪ، ﺑﻞ ﺍﻋﺘﻘﺪ ﺣﺼﻮﻝ ﺍﻷﺟﺮ ﺍﻟﻌﻈﻴﻢ ﻟﻬﻢ ﻓﻴﻪ، ﻓﻘﺎﻝ ‏( ﺭﺣﻤﻪ ﺍﻟﻠﻪ ‏) : ‏( ﻓﺘﻌﻈﻴﻢ ﺍﻟﻤﻮﻟﺪ، ﻭﺍﺗﺨﺎﺫﻩ ﻣﻮﺳﻤﺎ، ﻗﺪ ﻳﻔﻌﻠﻪ ﺑﻌﺾ ﺍﻟﻨﺎﺱ، ﻭﻳﻜﻮﻥ ﻟﻪ ﻓﻴﻪ ﺃﺟﺮ ﻋﻈﻴﻢ؛ ﻟﺤﺴﻦ ﻗﺼﺪﻩ، ﻭﺗﻌﻈﻴﻤﻪ ﻟﺮﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ . ﻛﻤﺎ ﻗﺪﻣﺘﻪ ﻟﻚ : ﺃﻧﻪ ﻗﺪ ﻳﺤﺴﻦ ﻣﻦ ﺑﻌﺾ ﺍﻟﻨﺎﺱ، ﻣﺎ ﻳﺴﺘﻘﺒﺢ ﻣﻦ ﺍﻟﻤﺆﻣﻦ ﺍﻟﻤﺴﺪﺩ ).
অর্থাৎ, "... বরং শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া স্বীয় কিতাব 'ইকতিদাউস সিরাতিল মুস্তাকীমে' মীলাদকে বিদআত বলা সত্ত্বেও মীলাদ পালনকারীদেরকে মা'যুর সাব্যস্ত করেছেন (অর্থাৎ, তাদেরকে মন্দ ভাবেন নি)। শুধু তাই নয়; মীলাদ পালন করার কারণে তাদের অনেক বড় সওয়াব হাসিল হবে বলেও মনে করেছেন। তিনি (ইবনে তাইমিয়া) বলেছেন: "মীলাদকে সম্মান করা এবং এটাকে নির্দিষ্ট দিবস বানানো -- এই কাজটা অনেকে করে থাকে। তার নেক নিয়্যাত এবং রাসূলের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কারণে এই কাজের জন্য সে সওয়াবও পাবে। যেমনটা আমি পূর্বেও বলে এসেছি যে, সাধারণ মুসলমানের এমন কিছু কিছু কাজকে মেনে নেয়া হয়, যেগুলো পোক্ত মুমিনের ক্ষেত্রে নিন্দনীয় হিসেবে ধরা হয়।"(৫)
শায়খ হাতিম আল-আওনী এখানে ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর বলা "নেক নিয়্যাত এবং রাসূলের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কারণে সে সওয়াবও পাবে" -- এই কথাটির উপর ফোকাস করেছেন। এর ভিত্তিতে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, ইবনে তাইমিয়া রহ. সামগ্রীকভাবে মীলাদকে মন্দ ভাবতেন না।
এই উদ্ধৃতিটি ছাড়া ইবনে তাইমিয়ার আর কোন বক্তব্য তিনি উল্লেখ করেন নি। মূলত: ইবনে তাইমিয়ার এ ধরণের আরো ২টি বক্তব্য পাওয়া যায়, যেগুলোকে সরল চোখে দেখলে মনে হবে যে, ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. মীলাদ পালনকরাকে সওয়াবের কাজ মনে করতেন।
১ম উদ্ধৃতি: ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেছেন:
ﻭﻛﺬﻟﻚ ﻣﺎ ﻳﺤﺪﺛﻪ ﺑﻌﺾ ﺍﻟﻨﺎﺱ، ﺇﻣﺎ ﻣﻀﺎﻫﺎﺓ ﻟﻠﻨﺼﺎﺭﻯ ﻓﻲ ﻣﻴﻼﺩ ﻋﻴﺴﻰ ﻋﻠﻴﻪ ﺍﻟﺴﻼﻡ، ﻭﺇﻣﺎ ﻣﺤﺒﺔ ﻟﻠﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ، ﻭﺗﻌﻈﻴﻤًﺎ . ﻭﺍﻟﻠﻪ ﻗﺪ ﻳﺜﻴﺒﻬﻢ ﻋﻠﻰ ﻫﺬﻩ ﺍﻟﻤﺤﺒﺔ ﻭﺍﻻﺟﺘﻬﺎﺩ، ﻻ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﺒﺪﻉ - ﻣﻦ ﺍﺗﺨﺎﺫ ﻣﻮﻟﺪ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻋﻴﺪًﺍ .
অর্থাৎ, "অনুরুপভাবে, খ্রীষ্টানরা যেমন হযরত ঈসা (আ) এর জন্মানুষ্ঠান পালন করে তেমনি তাদেরকে অনুসরণ করতে গিয়ে অথবা নবীজীর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন করতে গিয়ে কেউ কেউ মীলাদ সংক্রান্ত যেসব বিষয় আবিষ্কার করে, সেগুলোর ক্ষেত্রে আল্লাহ তাদেরকে সওয়াব দান করবেন, তাদের মুহাব্বাত এবং পরিশ্রমের কারণে, বিদআতের কারণে নয়।"(৬)
২য় উদ্ধৃতি: তিনি বলেছেন:
ﻭﺃﻛﺜﺮ ﻫﺆﻻﺀ ﺍﻟﺬﻳﻦ ﺗﺠﺪﻫﻢ ﺣﺮﺍﺻًﺎ ﻋﻠﻰ ﺃﻣﺜﺎﻝ ﻫﺬﻩ ﺍﻟﺒﺪﻉ، ﻣﻊ ﻣﺎ ﻟﻬﻢ ﻣﻦ ﺣﺴﻦ ﺍﻟﻘﺼﺪ، ﻭﺍﻻﺟﺘﻬﺎﺩ ﺍﻟﺬﻳﻦ ﻳﺮﺟﻰ ﻟﻬﻢ ﺑﻬﻤﺎ ﺍﻟﻤﺜﻮﺑﺔ ...
অর্থাৎ, "...এদের অধিকাংশ লোক, যাদেরকে এসব বিদআতের প্রতি গুরুত্বশীল হতে দেখো, যারা তাদের নেক নিয়্যাত এবং পরিশ্রমের কারণে সওয়াব পাবে বলে আশা করা যায়..."(৭)
উপরোল্লেখিত ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর ৩টি উদ্ধৃতিতে যে বিষয়টি কমন পাওয়া যাচ্ছে সেটা হলো: তিনি মীলাদ পালনকারীদের জন্য দু'টি ওজর তালাশ করেছেন -- নবী-প্রেম ও পরিশ্রম, এবং তাদের সওয়াব প্রাপ্তির ব্যাপারে আশা ব্যাক্ত করেছেন। এর থেকে শায়খ হাতিম আল-আওনী'সহ কেউ কেউ ধরে নিয়েছেন যে, ইবনে তাইমিয়া রহ. মীলাদ উদযাপন করাকে মন্দ ভাবেন নি। বরং শর্তসাপেক্ষে জায়েয মনে করতেন।
তাহলেতো এই মতটি পূর্বে উল্লেখিত তাঁর ফতোয়ার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে গেল! এর সমাধান কী হবে?
মূলত: আমরা যদি এই ৩টি উদ্ধৃতিকে সেগুলোর আগের এবং পরের ইবারতের সাথে মিলিয়ে দেখি তাহলেও এই সংশয় থাকার অবকাশ থাকে না যে, ইবনে তাইমিয়া রহ. মীলাদের ব্যাপারে কোন রকম শীতিলতা প্রদর্শন করেছিলেন।
০১ নং উদ্ধৃতির উপর পর্যালোচনা:
এটা শায়খ হাতিম আল-আওনী উল্লেখ করেছেন। এই কথাটি ইবনে তাইমিয়া রহ. মুসলমানদের আমলের প্রকার উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছেন। তিনি আমলকে ৩ ভাগে ভাগ করেছেন। যথা: ১. সর্বদিক দিয়ে নেক এবং জায়েয আমল, যেটাতে কোন রকমের কারাহাত বা নিন্দনীয় কিছু নেই। ২. ভালো এবং খারাপের মিশ্রিত আমল। যেগুলোতে নিয়্যাত বা অন্যকোন জায়েয কর্মের কারণে ভালো দিকও যেমন আছে, অনুরুপ অন্য হিসেবে দিয়ে খারাপ দিকও আছে। ৩. যেগুলো সর্বদিক দিয়ে মন্দ কাজ। ইবনে তাইমিয়া রহ. ২য় প্রকারের উদাহরণ দিতে গিয়ে মীলাদের কথা উল্লেখ করেছেন। এর পাশাপাশি তিনি এই প্রকারের মধ্যে ( ﺻﻮﻡ ﻭﺻﺎﻝ) বা লাগাতার নফল রোজা রাখা, বৈধ যৌনকর্ম ত্যাগ করা, কোন কোন রাতকে নির্দিষ্ট করে ইবাদত করা, যেমন রজব মাসের প্রথম রাত ইত্যাদি। এর সবগুলোর মধ্যে কিছু ভালো দিক আছে আবার কিছু মন্দ দিক আছে। মীলাদের রাতে এবং রজব মাসের প্রথম রাতে নামাজ, দোয়া দরুদ পড়া, যৌনতা এবং নফসের খাহেশাত থেকে দূরে থাকা, রোজা রাখা -- এসব হচ্ছে ভালো দিক। কিন্তু এগুলোর প্রত্যেকটিতেই মন্দ দিক আছে। মীলাদের রাত বা রজবের রাতের ইবাদতের মন্দ দিক হচ্ছে, এসব দিবসকে উদযাপন করা এবং এই উপলক্ষে বিশেষ ইবাদতের প্রচলন করা বিদআত। নবীজী, সাহাবীগণ এবং সালাফের কোন আলেমগণ এসব কষ্মিনকালেও করেন নি। এভাবে 'সওমে ওয়েসাল' বা লাগাতার নফল রোজা রাখার মধ্যে রোজা জিনিসটাতো নেক আমল, কিন্তু সেটাকে এভাবে বিরতিহীনভাবে রাখাটা মাকরুহ এবং সুন্নাত পরিপন্থি। এধরণের কাজগুলোর ক্ষেত্রে ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেছেন যে, যদি দ্বীনের ব্যাপারে সাধারণত উদাসীন থাকে এমন কোন সাধারণ মুসলমান যদি এই কাজগুলো করে ফেলে তাহলে সে তার 'নেক নিয়্যাতের' কারণে সওয়াব পাবে। দেখুন তাইমিয়া বলেছেন যে, সে ব্যাক্তি তার নিয়্যাতের কারণে সওয়াব পাবে। কিন্তু তাই বলে কাজটা বৈধ হয়ে যাবে না। বরং সেটা অবৈধই থাকবে। যেমন 'বিরতিহীনভাবে নফল রোজা রাখা' তার জন্য বৈধ হয়ে যায়নি। বৈধ স্ত্রী সঙ্গম ত্যাগ করা তার জন্য জায়েজ হয়ে যায়নি। অনুরুপভাবে সে বিদআতের বিষয়টি না জেনে যদি রবিউল আওয়াল মাসে মীলাদ উপলক্ষে নামাজ, সদকাহ ইত্যাদি কোন নেক আমল করে তাহলে সে তার নেক নিয়্যাতের কারণে সওয়াব পাবে। কারণ সে বিদআতের হুকুমটি জানে না। কিন্তু তাই বলে মীলাদ পালনকরাটা বৈধ হয়ে যাবে না, সেটা বিদআতই থাকবে। এর একটি উদাহরণও তিনি দিয়েছেন। ইমাম আহমাদ ইবনে হান্বাল (রহ) এর মাযহাব হচ্ছে কোরআন শরীফকে বিভিন্ন কারুকার্যময় করে সাজানো মাকরুহ। একদিন এক লোক এসে তাঁকে বললো: অমুক আমির তার কোরআনকে সজ্জিত করার পেছনে ১ হাজার দীনার ব্যায় করেছে। এটা শুনে ইমাম আহমাদ বললেন: "তাদেরকে ছেড়ে দাও। এটা তাদের স্বর্ণমুদ্রা ব্যায় করার জন্য ভালো জায়গা।" নতুবা তারা নর্তকিদের পেছনে গোনাহের কাজে সেগুলো ব্যায় করতো। ইমাম আহমাদের এই কথার অর্থ এই নয় যে, কোরআনকে স্বর্ণ-রুপা দিয়ে সজ্জিত করা বৈধ। বরং তিনি বিশেষ ব্যাক্তির ক্ষেত্রে তার বিশেষ পরিস্থিতির কারণে বলেছেন যে, তাকে ছেড়ে দাও। তাঁর নিকট কোরআনকে সজ্জিত করা মাকরুহ হওয়া'র মাসআলাটি অপরিবর্তিতই থাকবে। শায়খ হাতিম আল-আওনী ইবনে তাইমিযার যে ইবারতটির উদ্ধৃতি দিয়েছেন তার পরের ৩টি পৃষ্ঠা দেখলে এই কথাগুলো পষ্ট হয়ে যায়।(৮)
০২ নং উদ্ধৃতির পর্যালোচনা:
এই উদ্ধৃতির ক্ষেত্রেও একই কথা। এই ইবারতের উপরের ৫টি লাইনের উপর দৃষ্টি দিলে আমরা দেখতে পাই যে, ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেছেন:
"এই দিনটিকে (গদীরে খামের দিন) ঈদ হিসেবে পালন করা নবআবিষ্কৃত কাজ, যার কোন শরয়ী ভিত্তি নেই। সালাফের মধ্যে এবং আহলে বাইতের মধ্যে এমন কোনও ব্যাক্তি নেই যে এই দিনটিকে বিশেষ আমলের জন্য ঈদ হিসেবে উদযাপন করেছে। কারণ ঈদ হচ্ছে একটি শরীয়তের বিধান। অতএব, এ ক্ষেত্রে শরীয়তের পূর্ণ অনুসরণ করতে হবে। কোনভাবেই ইচ্ছে মতো নতুন কিছু আবিষ্কার করা যাবে না। ...... এরকম কাজগুলো মূলত ইহুদী এবং খ্রীষ্টানরা করে থাকে। খ্রীষ্টানরা যেমন হযরত ঈসা (আ) এর বিভিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠান পালন করে। বস্তুত ঈদ হচ্ছে শরয়ী বিধান। আল্লাহ শরীয়ত হিসেবে যেটা বৈধ করেছেন সেটা অনুকরণীয় হবে।"
এতটুকু বলার পরে তিনি বলেছেন:
"অনুরুপভাবে যারা খ্রীষ্টানদের অনুসরণ করে অথবা নবী-প্রেমের কারণে রাসূলুল্লাহ (স) এর নামেও এরকম কিছু করে থাকে তাহলে সে নেক নিয়্যাতের কারণে তো সওয়াব পাবে, কিন্তু তা কোনভাবেই তার বিদআত কর্মের কারণে নয়। তাছাড়া, মওলিদের তারিখ নিয়েতো এমনিতেই মতভিন্নতা আছে।"
এরপর তিনি বলেছেন:
"এই কাজটি পূর্ববর্তী আলেমদের মধ্যে কেউ করেন নি। (ﻣﻘﺘﻀﻲ ) থাকা সত্ত্বেও এবং ( ﻣﺎﻧﻊ) না থাকা সত্ত্বেও। যদি এটা নেক কাজ হতো তাহলে সালফগণই এই কাজের বেশী হকদার ছিলেন। কারণ তারা আমাদের চেয়েও নবীজীকে বেশী ভালোবাসতেন এবং সম্মান করতেন।"(৯)
ইবনেই তাইমিয়া রহ. এর এই বক্তব্যের মধ্যে ৩ টি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ:
১. তিনি মীলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানকে শীয়াদের অনুষ্ঠান 'গাদীরে খাম' এবং খ্রীষ্টানদের ক্রীষ্টমাসের সাথে তুলনা করে একই ক্যাটাগরীতে উল্লেখ করেছেন। অতএব, গদীরে খাম যদি না-জায়েয অনুষ্ঠান হয় তাহলে মীলাদুন্নবীকে ইবনে তাইমিয়া কিভাবে জায়েয মনে করবেন?
২. তিনি এগুলোকে 'ঈদ' (অর্থৎ 'অনুষ্ঠানের দিন') শব্দ দ্বারা ব্যক্ত করছেন। বর্তমানে যেমন 'ঈদে মীলাদুন্নবী' বলা হয়। তারপর তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, ঈদ 'তাওকীফী' বিষয়। এটা শরীয়তের একটি বিধান। শরীয়তে যে দিনগুলোকে বিশেষভাবে পালন করার বিধান রাখা হয়েছে সেগুলোকেই কেবল 'ঈদ' বা বিশেষ দিন হিসেবে পালন করা যাবে। খেয়ালখুশী মতো নতুন কিছু আবিষ্কার করা যাবে না।
৩. নবীজী, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন, তবেতাবেয়ীন এবং সালফে সালেহীনের মধ্যে কেউ কাজটি করে নি। মুক্তাদী (ﻣﻘﺘﻀﻲ ) থাকা সত্ত্বেও এবং মানে' (ﻣﺎﻧﻊ) না থাকা সত্ত্বেও। অর্থাৎ, রাসূলের জন্মকে কেন্দ্র করে কোন বিশেষ কিছু পালন করা যদি নেক কাজ হতো তাহলে অবশ্যই তার বিধান রাসূলের যুগেই নাযিল হতো। নবীজী এবং সাহাবীগণ সেটা পালন করতেন। যেমন আশুরার রোজার বিধান এসেছে। কারণ আল্লাহ দ্বীনকে পরিপূর্ণ করেছেন। কোন হুকুম বাদ রাখেন নি। এটা যদি দ্বীন হতো তাহলে তার তাকাজা বা দাবী হচ্ছে এই ব্যাপারে আল্লাহর হুকুম নাযিল হওয়া। দ্বিতীয়ত কোন (ﻣﺎﻧﻊ) বা বাধাও ছিলো না।
এই ৩ নং পয়েন্টটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে ইবনে তাইমিয়া রহ. বিদআতের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্তের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। বিদআত বলা হয় নবী-যুগ এবং সাহাবী-যুগের পরবর্তী সময়ে এমন নতুন কিছু আবিষ্কার করা যেটা ( ﻣﻘﺘﻀﻲ ) থাকা সত্ত্বেও এবং কোন রকম ( ﻣﺎﻧﻊ) না-থাকা সত্ত্বেও নবীজী এবং সাহাবায়ে কেরাম করেন নি এবং কোরআন-হাদীসে যার কোন (ﺃﺻﻞ ) বা ভিত্তি পাওয়া যায় না। এটা বিদআতের নিখুঁত সংজ্ঞা। এই সংজ্ঞাটিকে ইবনে তাইমিয়া রহ. মীলাদুন্নবীর উপর প্রয়োগ করেছেন। তারপরেও কি বলা হবে যে, ইবনে তাইমিয়্যা মীলাদকে সামগ্রীকভাবে বিদআত মনে করতেন না?!
০৩ নং উদ্ধৃতির পর্যালোচনা:
ইবনে তাইমিয়া রহ. এর এই বক্তব্যটা আরো বেশী স্পষ্ট। এই ইবারতটাকেও যদি আমরা তার পূর্বের এবং পরের কিছু ইবারতসহ পাঠ করি তাহলে দেখতে পাবো যে তিনি বলেছেন: "রাসূলের প্রকৃত ভালোবাসা হচ্ছে তার অনুসরণ-অনুকরণ করা, তার সুন্নাতকে ভেতরে বাইরে জিন্দা করা এবং এর পেছনে নিজের অন্তর, হাত এবং জবান দ্বারা সর্বাত্মক শ্রম ব্যায় করা। এটাই সকল সাহাবী এবং তাঁদের অনুসারীদের তরীকা। আর ঐ সকল লোক যাদেরকে তোমরা এ ধরণের বিদআত কর্মকান্ডের প্রতি বেশী আগ্রহী হতে দেখো -- যদিও তারা নেক নিয়্যাত এবং শ্রমের বদৌলতে সওয়াব পাবে বলে আশা করা যায় -- তাদেরকে তোমরা দেখবে যে, তারা নবীজী যেসকল কাজের নির্দেশ দিয়েছেন সেগুলো থেকে পলায়ন করে। এরা ঐসকল মানুষের মতো, যারা কোরআনকে বিভিন্নভাবে সজ্জিত করে রাখে, কিন্তু কোরআন পড়ে না। অথবা পড়ে, কিন্তু আমল করে না। এবং তাদের মতো যারা মসজিদে কারুকার্য করে ঠিকই, কিন্তু সেই মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে না।"(১০)
এই পূর্ণাঙ্গ ইবারতটি পড়ার পর কারো এরকম সংশয় জাগার কথা নয় যে, ইবনে তাইমিয়া রহ. তাঁর এই বক্তব্যের মাধ্যমে মীলাদের কোন প্রকারকে জায়েয দেখাতে চেয়েছেন। বরং তিনি এ ধরণের কর্মকান্ডকে নবী-প্রেমের নামে ভন্ডামী হিসেবে তুলে ধরেছেন। দু'টি উদাহরণ দিয়েও তিনি বিষয়টি বুঝিয়েছেন।
এতটুকু আলোচনা থেকে এটা যদিও প্রমানিত হয় যে, ইবনে তাইমিয়া রহ. এর সঠিক মতামত হচ্ছে, মীলাদুন্নবী সামগ্রীকভাবে এবং সর্বাবস্থাতেই বিদআত, কিন্তু একটা প্রশ্নের সুরাহা এখনো হয় নি। সেটা হচ্ছে, ইবনে তাইমিয়ার নিকট মীলাদুন্নবী বিদআত হলে তিনি কেন এই বিদআত কর্ম পালনকারীরর সওয়াব প্রাপ্তির ব্যাপারে আশা প্রকাশ করেছেন? বিদআত কাজ করে কিভাবে একজন ব্যাক্তি সওয়াবের হকদার হতে পারে?
এই প্রশ্নটার সহজ সমাধান আছে।
ইবনে তাইমিয়া রহ. এর উপরোক্ত ৩টি উদ্ধৃতির উপর হালকা নজর বুলালেও বুঝে আসে যে, তিনি এখানে 'মীলাদুন্নবী' পালনকারীকে অজ্ঞ হিসেবে দেখেছেন। অর্থাৎ, যে ব্যাক্তি জানেই না যে, মীলাদ পালন করা বিদআত, সে যদি রবিউল আওয়াল মাসের মীলাদকে কেন্দ্র করে দরুদ, নাত, সাদাকাহ ইত্যাদি বিশেষ কোন নেক আমল করে, তাহলে সে তার নেক নিয়্যাতের কারণে এবং রাসূলের প্রতি ভালোবাসার কারণে সওয়াব পাবে। তার বিদআত কাজটাকে এই জন্য ধরা হচ্ছে না যে, সে কাজটি অজ্ঞতাবশত করেছে। অজ্ঞতাবশত কেবল বিদআত কেন, কেউ হারাম কাজ করলেও ইসলামের বিধান হচ্ছে সেটাকে ওজর হিসেবে ধরা। এ প্রসঙ্গে ইবনে তাইমিয়া রহ. আরো স্পষ্ট করে বলেছেন:
ﺃﻥ ﻣﻦ ﻛﺎﻥ ﻟﻪ ﻧﻴﺔ ﺻﺎﻟﺤﺔ ﺃﺛﻴﺐ ﻋﻠﻰ ﻧﻴﺘﻪ، ﻭﺇﻥ ﻛﺎﻥ ﺍﻟﻔﻌﻞ ﺍﻟﺬﻱ ﻓﻌﻠﻪ ﻟﻴﺲ ﺑﻤﺸﺮﻭﻉ، ﺇﺫﺍ ﻟﻢ ﻳﺘﻌﻤﺪ ﻣﺨﺎﻟﻔﺔ ﺍﻟﺸﺮﻉ .
অর্থাৎ, "যার ভালো নিয়্যাত থাকবে সে তার নিয়্যাতের কারণে সওয়াব পাবে, যদিও তার কৃত কাজটি প্রকৃতভাবে না-জায়েয হয়, যদি সে ইচ্ছেকৃতভাবে শরীয়তের বিরোধীত না করে।" (১১) অর্থাৎ যদি সে কাজটা অজ্ঞতাবশত করে।
এর থেকে বোঝা যায় যে, যারা মীলাদ যে বিদআত সেটা কারো কাছে শুনেছে, অথবা এই বিষয়টা জানার তাদের সুযোগ ছিলো, তারপরেও তারা ইচ্ছেকৃতভাবে বা ঘাড়ত্যাড়ামি করে মীলাদুন্নবী পালন করেছে, তারা কোন অবস্থাতেই নিয়্যাতের কারণে সওয়াবের হকদার হবে না। নিয়্যাতের কারণে সওয়াব পাওয়া সংক্রান্ত ইবনে তাইমিয়্যার কথাগুলো তার উপর প্রযোজ্য হবে না। অর্থাৎ সওয়াব পাওয়ার বিষয়টিকে ইবনে তাইমিয়্যা রহ. বিশেষ একটি অবস্থার সাথে 'খাস' করেছেন। সেটা হচ্ছে এই বিষয়ে মীলাদ পালনকারীর (ﺟﻬﺎﻟﺔ ) বা অজ্ঞতা। এটাকে ( ﺍﻟﻌﺬﺭ ﺑﺎﻟﺠﻬﺎﻟﺔ ) ওজর বিল জাহালা ধরা হবে। কিন্তু সে কারণে তার উদযাপন করা মীলাদটির হুকুমের মধ্যে কোন পরিবর্তন আসবে না। সেটা বিদআতই থাকবে। এই কথাটা ইবনে তাইমিয়া রহ. বারবার স্পষ্ট করেছেন।
কিন্তু আমাদের উস্তাদে মুহতারাম শায়খ শরীফ হাতিম আল-আওনী হাফিজাহুল্লাহ ইবনে তাইমিয়া রহ. এর খন্ডিত একটি বক্তব্যকে উল্লেখ করেছেন। যার ফলে মীলাদের বিষয়ে ইবনে তাইমিয়ার অবস্থান সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে। একি সাথে সেটা আমাদের দেশের কিছু তালিবে ইলমের বিভ্রান্তিরও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আল্লাহ আমাদের সকলকে দ্বীনের সহীহ বুঝ দান করুন।
ওয়াল্লাহু ওয়ারা-আল কাসদ!
_______________________
টিকাঃ
(১) মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনে তাইমিয়া - ২৫/২৯৮।
(২) ইকতিদাউস সিরাতিল মুস্তাকীম, ইবনে তাইমিয়া - ২/১২৩।
(৩) ইকতিদাউস সিরাতিল মুস্তাকীম - ২/৮২।
(৪) ইকতিদাউস সিরাতিল মুস্তাকীম - ২/৮২।
(৫) ইসলাম অনলাইন সাইটে ২৩/১/২০১৩ তারিখে প্রকাশিত শায়খ শরীফ হাতেম আল আওনীর ফতওয়া।
(৬) ইকতিদাউস সিরাতিল মুস্তাকীম - ২/১২৩।
(৭) ইকতিদাউস সিরাতিল মুস্তাকীম- ২/১২৪।
(৮) ইকতিদাউস সিরাতিল মুস্তাকীম- ২/১২৬ - ১২৮।
(৯) ইকতিদাউস সিরাতিল মুস্তাকীম - ২/১২৩।
(১০) ইকতিদাউস সিরাতিল মুস্তাকীম- ২/১২৪।
(১১) ইকতিদাউস সিরাতিল মুস্তাকীম- ২/২৫১।

Monday, November 11, 2019

আশেকে রসূল সঃ এর প্রকারভেদ

আশেকে রসুল সঃ এর প্রকারভেদঃ
‌ ‌ _-_- _-_-
পাক ভারত উপ মহাদেশে রবিউল আওয়াল মাস আসলে এক শ্রেনীর লোকের মাঝে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুহাব্বতের জোশ উতলে উঠে। বিশেষ করে ১২ই রবিউল আওয়াল, অন্য সময় যেমন-তেমন এই তারিখে কাফের, ফাছেক ও ফাজেরদের উদ্ভাবিত অন্যান্য দিবস যেমন: মা দিবস, বাবা দিবস, ভালবাসা দিবস, এর মত করে এ দিবসটি পালন করতে এরা উঠে-পড়ে লেগে যায়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ থেকে নিয়ে অদ্যাবধি পর্যন্ত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা এধরণের বেশ কয়েক শ্রেনীর মৌসুমী আশেকে রাসূল দেখতে পাই। নিম্নে তাদের কর্ম পদ্ধতি ও পরিণতি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করা হল।
(১) যারা শুধু মৌখিকভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গুন-কির্তন গায় কিন্তু তাঁর সীরাত তথা আদর্শে আদর্শবান হতে রাজী নয়।
এ শ্রেনীর লোক স্বয়ং নবী যুগেও ছিল বর্তমানে ও আছে। যেমন: উম্মতে মুহাম্মাদীর " ফিরআউন " নামে খ্যাত আবু জাহাল, যে চল্লিশ ‌বৎসর পর্যন্ত রাসূলের গুন গান গেয়েছে, এমনকি " আল্ আমীন " তথা জগৎস্রেষ্ঠ সত্য বাদী, আমানতদার বলে আখ্যায়িত করে ছিল, কিন্তু তাঁর আদর্শ গ্রহনে রাজী হওয়া তো‌ দূরের কথা বরং চরম ও পরম শত্রু ই ছিল আজীবন।
পরিণতিঃ
এ শ্রেনীর আশেকদের পরিনতি সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেনঃ
" ان شجرت الزقوم، طعام الاثيم، كالمهل-يغلى فى البطون كغلى الحميم، خذوه فاعتلوه الى سواء الجحيم ثم صبوا فوق رأسه من عذاب الحميم*
নিশ্চয় জাক্কুম বৃক্ষ, পাপীর ( আবু জাহল ও তার অনুসারীদের ) খাদ্য হবে; যা গলিত তাম্রের ন্যায় পেটে ফুটতে থাকবে, যেমন ফুটে পানি। (অতপর ফেরেস্তাদের
বলা হবে একে ধর এবং টেনে নিয়ে‌ যাও জাহান্নামের মধ্যস্থলে, অতপর তার মাথার উপর ফুটন্ত পানির আযাব ঢেলে দাও। ( দুখানঃ ৪৩-৪৮ )
(২) যারা রাসূলের মুহাব্বতে জান দিতে প্রস্তুত কিন্তু তাঁর আনিত দ্বীন মানতে রাজী নয়। ওদের অস্তিত্ব সে যুগেও ছিল এ যুগে ও আছে, যেমন: আবু তালিব, যিনি ‌নবীর মুহাব্বতে সদা জান, মান ও প্রান দিতে প্রস্তুত ছিলেন ।
পরিণতিঃ
জীবনের শেষ মূহুর্তে রাসূলের দাওয়াত অগ্রাহ্য করে যখন বলে ছিলেন, " اخترت النار على العار " আমি তোমার দ্বীন গ্রহন করে পরকালে নাজাত পাব নিশ্চিত কিন্তু লোকজন যে আমাকে ধিক্কার দিবে। অতএব আমি এর বিনিময়ে জাহান্নামের আগুনকে ই বরণ করে নিলাম। রাসূল (দঃ) এরশাদ করেন যে, পর কালে জাহান্নামে আমার চাচা আবু তালিবের পায়ে আগুনের তৈরী একজোড়া জুতা পড়িয়ে দেয়া হবে, যার তাপে তার মাথার মগজ পর্যন্ত বুদবুদের মত টগবগ করে উৎলাতে থাকবে, আর এ আজাবে তাকে থাকতে হবে চির কাল।
(৩) যাদের নবী প্রেম শুধু তাঁর জন্মদিন কেন্দ্রিক, যারা তাঁর জন্মদিনে বিজাতিদের অনুকরণে মিলাদুন্নবী নামে অনুষ্ঠান করে আনন্দ-ফুর্তি করে বেড়ায়। বর্তমানে আমাদের সমাজে এদেরকে কোন-কোন এলাকায় বেশ তৎপর দেখা যায়। এ শ্রেনীটির অস্তিত্ব ও রাসূলের যুগে ছিল আর বর্তমানে ও আছে। এদের জন্মদাতা গুরুর নাম " আবু লাহাব "। সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম দিনে, তাঁর জন্মের সু-সংবাদ প্রদানকারীনি মহা মূল্যবান দাসী সুরাইয়া কে চিরমুক্ত করে দিয়ে ছিল। কিন্তু ব্যক্তি জীবনে রাসূলের আদর্শ গ্রহনে শুধু নারাজ ই নারাজ ছিল না, বরং তা প্রতিহতে করণে ছিল বদ্ধ পরিকর।
পরিণতিঃ
এ গুরুজির পরিনতি সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেনঃ تبت يدا ابى لهب وتب، ما اغنى عنه ماله وما كسب *
আবু লাহাবের ইহ ও পরকাল হবে। তার সহায়-সম্পদ ও সন্তান -সন্ততি আমার ধ্বংসজজ্ঞ থেকে তাকে রক্ষা করতে পারবে না।
(৪) যারা মনে-প্রানে তাঁকে শুধু ভালই বাসেন না বরং তাঁর আনিত ধর্ম আন্তরিকতার সাথে গ্রহন করে বিজাতীয় অনুকরণে যে কোন প্রকারের আনুষ্ঠানিকতা বর্জন করতঃ তাঁর সীরত তথা জীবন চরিত অনুস্বরণে জীবন পরিচালনায় বদ্ধপরিকর। তাঁরা ঐ শ্রেনীটির অন্তর্ভূক্ত যে শ্রেনীটিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের পবিত্র তত্বাবধানে গঠন করে গিয়েছেন, এবং তাঁরাই হলেন একমাত্র সত্যিকার নবী প্রেমিক বা আশেকে রাসূল।
পরিণতিঃ
এঁদের পরিণতি সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা'আলার ঘোষনাঃ " ومن يطع الله والرسول فاولاءك مع الذين انعم الله عليهم من النبين والصديقين والشهداء والصالحين، وحسن اولأك رفيقا*
যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের হুকুম মান্য করবে , তাহলে যাদের প্রতি আল্লাহ নেয়ামত দান করেছেন সে তাদের সঙ্গী হবে। তাঁরা ‌হলেন নবী,ছিদ্দীক,শহীদ ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিবর্গ। আর তাদের ‌সান্নিধ্যই হল উত্তম।
উপরোক্ত আলোচনা হতে ইহা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, একমাত্র চতুর্থ শ্রেনীর আশেকে রাসূলগনই প্রকৃত পক্ষে আশেকে রাসূল এবং তাদের জন্যই পরকালে জান্নাতে নবীজির সাক্ষাতের ওয়াদা রয়েছে।
আল্লাহ তা'আলা আমাদের কে এ শ্রেনীর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন।

বাচ্চাদের প্রাথমিক রুকইয়াহ ও বিধিনিষেধ

প্রাথমিক রুকইয়াহ পদ্ধতিঃ  ১।   মানুষ ও জ্বীনের বদনজর ও জ্বীনের আছর থেকে হিফাযত ও শিফার নিয়তে - দুরুদে ইব্রাহিম, সুরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি,...