Showing posts with label রমাদন ও সিয়াম. Show all posts
Showing posts with label রমাদন ও সিয়াম. Show all posts

Sunday, April 2, 2023

ইফতার কেন দ্রুত করবো?

 ইফতার কেন দ্রুত করবো?

• মহান আল্লাহ বলেন, ثم اتموا الصيام الى الليل অর্থাৎ অতঃপর তোমরা রাতের প্রারম্ভ পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ করো (২/২৮৭)।

আয়াতে বলা হয়েছে الى الليل (রাত পর্যন্ত), بعد النهار (দিন শেষে) বলা হয়নি। যদি "দিন শেষে" বলা হতো তাহলে দিনের শেষে আপনার যতক্ষণ ইচ্ছা দেরি করার এখতিয়ার থাকতো। কিন্তু যখন বলা হয়েছে "রাত পর্যন্ত" তখন বিনা ওজরে সিয়ামকে রাতে প্রবেশ করানোর সুযোগ নেই। কেননা, الى আসে কোন বিষয়কে সম্বন্ধিত করে উদ্দিষ্ট বিষয়ের অন্তসীমা বুঝানোর জন্য। উদ্দিষ্ট বিষয়কে সম্বন্ধিত বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নয়। যেমন কেউ বললো, আমার উঠোনের শেষ সীমানা হলো সিটি কর্পোরেশনের দেয়াল পর্যন্ত। এর অর্থ এই নয় যে সে দেয়ালের ওপার থেকেও দুয়েক ফুট দাবি করতে পারবে। কাজেই সূর্য অস্ত যাওয়ার পরপরই ইফতার সেরে নিতে হবে। সতর্কতার বাহানায় ২/৩ মিনিট দেরিতে ইফতারকারী হলো ঐ সমস্ত বোকা দৌঁড়বিদের মত যারা নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম করেও মনে করে আমাকে আরো ২/৩ কদম যেতে হবে।

• ইফতারের সঠিক সময়..

 عن عمر بن الخطاب: إذا أقْبَلَ اللَّيْلُ مِن ها هُنا، وأَدْبَرَ النَّهارُ مِن ها هُنا، وغَرَبَتِ الشَّمْسُ فقَدْ أفْطَرَ الصّائِمُ..

"ওমর বিন খাত্তাব (রা.) হতে বর্ণিত, যখন এদিক থেকে রাত ঘনিয়ে আসবে আর ওদিক থেকে দিন চলে যাবে এবং সূর্য ডুবে যাবে সঙ্গে সঙ্গে সিয়াম পালনকারী ইফতার সেরে নিবে।"

صحيح البخاري ١٩٥٤ 

ইমাম ইবনে হাজম (রহ.) বলেন,

وَمِنْ السُّنَّةِ تَعْجِيلُ الْفِطْرِ وَتَأْخِيرُ السُّحُورِ ، وَإِنَّمَا هُوَ مَغِيبُ الشَّمْسِ عَنْ أُفُقِ الصَّائِمِ وَلا مَزِيدَ

"সুন্নাহ হলো দ্রুত ইফতার করা ও দেরিতে সাহরী খাওয়া। আর সাহরীর অন্তসীমা থেকে সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্তই হলো সিয়ামের নির্ধারিত সময়। এর অতিরিক্ত নয়।"

المحلى، ٤/٣٨٠

অনেকেই মনে করে আজান হলে পরে ইফতার। অথচ আজানের সাথে ইফতারের কোন সম্পর্কই নাই। আজান যিনি দেন তিনিও ইফতার করেই দেন। তাছাড়া বিশ্বের বহু অমুসলিম দেশে কোন আজানই হয় না। সেখানকার মুসলমানরা কি ইফতার করবে না?

মুলত ইফতারের সম্পর্ক সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে। কোনভাবেই আজানের সাথে নয়। হাফেজ ইবনে হাজার আসক্বলানী (রহ.) এ বিষয়ে ইজমা নকল করে বলেন,

واتَّفَقَ العُلَماءُ عَلى أنَّ مَحَلَّ ذَلِكَ إذا تَحَقَّقَ غُرُوبُ الشَّمْسِ بِالرُّؤْيَةِ أوْ بِإخْبارِ عَدْلَيْنِ وكَذا عدل واحِد فِي الارجح

"সমস্ত ওলামায়ে কেরাম একথার উপর একমত যে ইফতারের সঠিক সময় হলো যখন সূর্যের অস্ত যাওয়া দেখার মাধ্যমে কিংবা দুইজন বিশ্বস্ত লোকের সংবাদের মাধ্যমে নিশ্চিত জানা যাবে। অনুরূপ গ্রহণযোগ্য মতানুসারে একজন বিশ্বস্ত লোকের সংবাদের মাধ্যমে হলেও চলবে।"

فتح الباري، ٤/١٩٩

তিনি আরো বলেন,

مِنَ البِدَعِ المُنْكَرَةِ ما أُحْدِثَ فِي هَذا الزَّمانِ مِن إيقاعِ الأذانِ الثّانِي قَبْلَ الفَجْرِ بِنَحْوِ ثُلُثِ ساعَةٍ فِي رَمَضانَ وإطْفاءِ المَصابِيحِ الَّتِي جُعِلَتْ عَلامَةً لِتَحْرِيمِ الأكْلِ والشُّرْبِ عَلى مَن يُرِيدُ الصِّيامَ زَعْمًا مِمَّنْ أحْدَثَهُ أنَّهُ لِلِاحْتِياطِ فِي العِبادَةِ ولا يَعْلَمُ بِذَلِكَ إلّا آحادُ النّاسِ وقَدْ جَرَّهُمْ ذَلِكَ إلى أنْ صارُوا لا يُؤَذِّنُونَ إلّا بَعْدَ الغُرُوبِ بِدَرَجَةٍ لِتَمْكِينِ الوَقْتِ زَعَمُوا فَأخَّرُوا الفِطْرَ وعَجَّلُوا السُّحُورَ وخالَفُوا السُّنَّةَ فَلِذَلِكَ قَلَّ عَنْهُمُ الخَيْر وكثير فِيهِمُ الشَّرُّ واللَّهُ المُسْتَعانُ

"এই জমানায় যে গর্হিত বিদাতগুলো প্রবর্তিত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে রমযান মাসে ফজর হওয়ার ২০ মিনিট আগে দ্বিতীয় আযান দেয়া এবং বাতিগুলো নিভিয়ে দেয়া। যে বাতিগুলো রোযা রাখতে ইচ্ছুক ব্যক্তির জন্য পানাহার নিষিদ্ধ হওয়ার আলামত হিসেবে রাখা হয়। যে ব্যক্তি এটি প্রবর্তন করেছে সে এই ধারণা থেকে করেছে যে, এতে ইবাদতের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করা হবে। গুটি কতেক মানুষ ছাড়া আর কাউকে বিষয়টি জানায় না। একই চিন্তা থেকে তারা সূর্য ডোবার কিছু সময় পরে আযান দেয়; তাদের ধারণা অনুযায়ী যাতে করে সময় হওয়াটা জোরদার হয়। এভাবে তারা দেরিতে ইফতার করে ও তড়িঘড়ি সাহরী সেরে মুলত সুন্নাহ'র বিপরীতে আমল করে যাচ্ছে। তাই তাদের মাঝে কল্যাণ হ্রাস পেয়েছে এবং অকল্যাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আল্লাহ সহায় হোন।"

فتح الباري، ٤/١٩٩

• দ্রুত ইফতার করা সুন্নাহ..

حَدَّثَنا وكِيعٌ، عَنْ أبِي العَنْبَسِ عَمْرِو بْنِ مَرْوانَ، قالَ: سَمِعْتُ إبْراهِيمَ، يَقُولُ: إنَّ مِنَ السُّنَّةِ تَعْجِيلَ الإفْطارِ

"ইব্রাহীম নখয়ী (রহ.) বলেন, সুন্নাহ হলো দ্রুত ইফতার করা।"

مصنف ابن أبي شيبة، ٢/‏٢٧٨ 

ইমাম রাফেয়ী (রহ.) বলেন,

من سنن الصوم تعجيل الفطر قال صلي الله عليه وسلم لا يزال الناس بخير ما عجلوا الفطر

"দ্রুত ইফতার করা হলো রোযার সুন্নাহ। যেমন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জাতি ততদিন কল্যাণের উপর থাকবে যতদিন তারা দ্রুত ইফতার করবে।"

الشرح الكبير للرافعي، ٦/‏٤١٧

• দ্রুত ইফতার সুন্নাত হওয়ার উপর ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে..

قال ابن عبد البر وغيره : وأجمع العلماء على أنّ تعجيل الفطر، وتأخير السحور، سنة متبعة، حكاه الوزير ابن هبيرة، وجزم به الشيخ تقي الدين.

"হাফেজ ইবনে আব্দিল বার (রহ.) ও অন্যান্যরা নকল করেন, ওলামায়ে কেরামগণ এ কথার উপর একমত হয়েছেন যে, দ্রুত ইফতার করা ও  দেরিতে সাহরী খাওয়া হলো অনুসরণীয় সুন্নাহ। এটি বর্ণনা করেছেন ইমাম ওজির ইবনে হুবায়রা (রহ.) এবং শায়খুল ইসলাম তকি উদ্দিন ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এটির সত্যায়ন করেছেন।"

توضيح الأحكام من بلوغ المرام، ٣/‏٤٧١

ইমাম ইবনুল আছীর (রহ.) নকল করেন,

وتعجيل الإفطار سنة متفق عليها

"দ্রুত ইফতার করা সুন্নাত এ বিষয়ে সবাই একমত।"

الشافي في شرح مسند الشافعي، ٣/‏١٩٨

• দ্রুত ইফতার আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম..

 عن أبي هريرة: قال اللهُ : أحَبُّ عبادِي إلَيَّ، أعْجَلُهُم فِطْرًا.

"আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, মহান আল্লাহ বলেন আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় বান্দা হলো যারা দ্রুত ইফতার করে।"

سنن الترمذي ٧٠٠ 

ইমাম তিরমিজি (রহ.), বাগভী (রহ.), ইবনে হাজার আসক্বলানী (রহ.), ইবনুল মুলাক্কিন (রহ.), মুনযিরী (রহ.), বিন বায (রহ.) প্রত্যকেই স্ব স্ব গ্রন্থে হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। ইবনে হিব্বান (রহ.) তাঁর সহিহ'তে উল্লেখ করেছেন। শায়খ শুয়াইব আল আরনাউত (রহ.) ও আহমাদ শাকের উভয়ে সহিহ বলেছেন।

• সাহাবীদের নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর দ্রুত ইফতার..

 عن عبد الله بن أبي أوفى: كُنّا مع رَسولِ اللهِ ﷺ في سَفَرٍ فَقالَ لِرَجُلٍ: انْزِلْ فاجْدَحْ لِي، قالَ: يا رَسولَ اللهِ، الشَّمْسُ؟ قالَ: انْزِلْ فاجْدَحْ لِي، قالَ: يا رَسولَ اللهِ الشَّمْسُ؟ قالَ: انْزِلْ فاجْدَحْ لِي، فَنَزَلَ فَجَدَحَ له فَشَرِبَ، ثُمَّ رَمى بيَدِهِ ها هُنا، ثُمَّ قالَ: إذا رَأَيْتُمُ اللَّيْلَ أقْبَلَ مِن ها هُنا، فقَدْ أفْطَرَ الصّائِمُ، تابَعَهُ جَرِيرٌ، وأَبُو بَكْرِ بنُ عَيّاشٍ، عَنِ الشَّيْبانِيِّ، عَنِ ابْنِ أبِي أوْفى قالَ: كُنْتُ مع النبيِّ ﷺ في سَفَرٍ..

"আব্দুল্লাহ ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সঙ্গে সফর অবস্থায় ছিলাম। পথিমধ্যে রাসুলুল্লাহ (সা.) এক সাহাবীকে বললেন, সওয়ারী হতে নেমে আমার জন্য ছাতু গুলিয়ে আন। সাহাবী বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সূর্য এখনো অস্ত যায়নি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, সওয়ারী হতে নেমে আমার জন্য ছাতু গুলিয়ে আন। সাহাবী বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সূর্য এখনো ডুবেনি। রাসুলুল্লাহ (সা.) আবারো বললেন, সওয়ারী হতে নামো এবং আমার জন্য ছাতু গুলিয়ে আন। অতঃপর সেই সাহাবী সাওয়ারী হতে নেমে ছাতু গুলিয়ে আনলেন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) তা পান করলেন। তারপর হাত দিয়ে ইশারা করে বললেন, যখন দেখবে রাত এদিক হতে ঘনিয়ে আসছে তখন বুঝবে, সওম পালনকারী ব্যক্তির ইফতারের সময় হয়েছে।"

 صحيح البخاري ١٩٤١  

কিছু অজমুজতাহিদ এই হাদীসে সূর্য ডুবার পর ২/৩ মিনিট দেরি করার দলিল খুঁজে পেয়েছে। তাদের দাবি হলো সূর্য ডুবার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কথাবার্তা বলা এবং সাহাবীর সওয়ারী হতে নেমে ছাতু গুলিয়ে আনা, তারপর ইফতার করা এতে ২/৩ মিনিট তো লেগেছেই। তাছাড়া একটু দেরি হলেই যদি সুন্নাহ বিরোধী হয় তাহলে রাসুলুল্লাহ (সা.) সূর্য ডুবার আগে কেন ইফতার তৈরি করলেন না?

হাদীসটি আরেকবার পড়ে আসুন। দেখুন সাহাবী কিন্তু বারবার বলছিলেন হে আল্লাহর রাসুল! সূর্য এখনো ডুবেনি। তাহলে এই অজমুজতাহিদরা এটাকে সূর্য ডুবার পরের ঘটনা কেমনে বানালো? আরেকটা বিষয় লক্ষ্য করুন, সাহাবী বারবার তাগাদা দিচ্ছিলেন হে আল্লাহর রাসুল! সূর্য এখনো ডুবেনি। অর্থাৎ ইফতারের সময় এখনো হয়নি। এত তাড়াহুড়া কেন করছেন? রাসুলুল্লাহ (সা.) চাইলে তৎক্ষনাৎ মাসআলা হল করে দিতে পারতেন। যেহেতু দ্রুত ইফতারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ সেহেতু তিনি কোন কথাবার্তা ছাড়াই আগে ইফতার করে নিলেন, তারপর মাসআলা বললেন। ২/৩ মিনিট দেরি হলে যদি সমস্যা না থাকতো তাহলে তিনি অবশ্যই আগে মাসআলা সমাধান করতেন। যাতে সবাই নিঃসন্দেহে প্রশান্ত মনে ইফতার করতে পারেন।

আর রাসুলুল্লাহ (সা.) কেন সূর্য ডুবার আগে ইফতার তৈরি করলেন না?

মুলত ইফতার তৈরি প্রক্রিয়া সূর্য ডুবার আগেই হয়েছে। যেই সাহাবী ইফতার তৈরি করেছেন তিনিই বারবার জানান দিচ্ছিলেন হে আল্লাহর রাসুল! সূর্য এখনো ডুবেনি। তাছাড়া সফর অবস্থার হালচাল স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে একটু ব্যতিক্রম হতেই পারে।

স্বাভাবিক অবস্থায় সাহাবায়ে কেরামগণ সূর্য ডুবার আগেই ইফতার তৈরি করে নিতেন।..

عَنْ أبِي رَجاءٍ قالَ: كُنْتُ أشْهَدُ ابْنَ عَبّاسٍ عِنْدَ الفِطْرِ فِي رَمَضانَ، فَكانَ يُوضَعُ طَعامُهُ، ثُمَّ يَأْمُرُ مُراقِبًا يُراقِبُ الشَّمْسَ، فَإذا قالَ: وجَبَتْ قالَ: كُلُوا قالَ: ثُمَّ كُنّا نُفْطِرُ قَبْلَ الصَّلاةِ

"আবু রাজা (রহ.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রমযান মাসে ইফতারের সময় ইবনে আব্বাস (রা.) এর সাথে সাক্ষাৎ করতাম। তাঁর খাবার তৈরি করে রাখা হতো। তারপর তিনি একজন পর্যবেক্ষককে সূর্য দেখার নির্দেশ দিতেন। যখন পর্যবেক্ষক বলতো সূর্য অস্ত গেছে, তখন তিনি বলতেন তোমরা খাও। বর্ণনাকারী বলেন, তারপর আমরা সালাতের আগে ইফতার করে নিতাম।"

مصنف عبد الرزاق الصنعاني، ٤/‏٢٢٧ 

• সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এর দ্রুত ইফতারের অভ্যাস ও আম্মাজান আয়িশা (রা.) এর ফতোয়া..

 عن مالك بن عامر أبي عطية الوادعي: قلتُ لعائشةَ: فينا رجُلانِ، أحَدُهما يُعَجِّلُ الإفطارَ ويُؤخِّرُ السُّحورَ، والآخَرُ يُؤخِّرُ الفِطرَ ويُعَجِّلُ السُّحورَ. قالت: أيُّهما الذي يُعجِّلُ الإفطارَ ويُؤخِّرُ السُّحورَ؟ قلتُ: عبدُ اللهِ بنُ مَسعودٍ. قالتْ: هكذا كان رسولُ اللهِ ﷺ يَصنَعُ..

"আবু আত্বিয়া (রহ.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- আমি আয়িশা (রা.) কে বললাম আমাদের মাঝে দুজন ব্যক্তি এমন আছেন যাঁদের একজন দ্রুত ইফতার করেন এবং দেরিতে সাহরী করেন। অন্যজন দেরিতে ইফতার করেন এবং দ্রুত সাহরী খেয়ে নেন। আয়িশা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, দ্রুত ইফতার করা এবং দেরিতে সাহরী খাওয়া ব্যক্তিটা কে? আমি বললাম আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)। আম্মাজান আয়িশা (রা.) বললেন, এই আমলটাই রাসুলুল্লাহ (সা.) করতেন।"

سنن النسائي ٢١٥٨ ، اسناده صحيح

• দ্রুত ইফতার নববী চরিত্রের চিহ্ন..

 عن أبي الدرداء: ثلاثٌ من أخلاقِ النُّبوةِ: تَعجيلُ الإفطارِ، وتأخيرُ السُّحورَ، ووضْعُ اليمينِ على الشِّمالِ في الصلاةِ.

"আবু দারদা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনটি বিষয় নববী আদর্শের অন্তর্ভুক্ত। তা হলো দ্রুত ইফতার করা, দেরিতে সাহরী খাওয়া এবং সালাতে বাম হাতের উপর ডান হাত রাখা।"

صحيح الجامع ٣٠٣٨ 

ইমাম মালেক (রহ.) বলেন,

سمعت عبد الكريم بن المخارق يقول: من عمل النبوة تعجيل الإفطار، والاستيناد بالسحور

"আমি আব্দুল কারীম ইবনে মুখারাক (রহ.) কে বলতে শুনেছি যে, দ্রুত ইফতার করা ও ধীরস্থিরে সাহরী খাওয়া নববী কর্মের অন্তর্ভুক্ত।"

شرح الرسالة للقاضى عبد الوهاب، ١/١٧١

• প্রত্যেক নবী-রাসুলের প্রতি দ্রুত ইফতার করার নির্দেশ ছিল..

 عَنِ ابْنِ عَبّاسٍ قالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُولُ: إنّا مَعاشِرَ الأنْبِياءِ أُمِرْنا أنْ نُعَجِّلَ فِطْرَنا، وأنْ نُؤَخِّرَ سُحُورَنا، وأنْ نَضَعَ أيْمانَنا عَلى شَمائِلِنا فِي الصَّلاةِ

"আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি যে, আমাদের সমস্ত নবী-রাসুলদের উপর নির্দেশ  ছিল যাতে আমরা দ্রুত ইফতার করি, সাহরীতে দেরি করি এবং সালাতে আমাদের ডান হাতকে বাম হাতের উপর রাখি।"

مجمع الزوائد ٣‏/١٥٨،  رجاله رجال الصحيح 

• দেরিতে ইফতার করা হলো ইহুদী-খৃস্টানের নীতি..

عن أبي هريرة: لا يزالُ الدِّينُ ظاهرًا ما عجَّل النّاسُ الفِطْرَ إنّ اليهودَ والنَّصارى يؤخِّرونَ.

"আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, দ্বীন ততদিন পর্যন্ত বিজয়ী থাকবে যতদিন পর্যন্ত মুসলমান দ্রুত ইফতার করবে। অবশ্যই ইহুদী খৃষ্টানরা ইফতারে দেরি করে।"

صحيح ابن حبان ٣٥٠٣ 

ইমাম ত্বিবী (রহ.) এই হাদীসের ব্যাখায় বলেন,

قالَ الطِّيبِيُّ: فِي هَذا التَّعْلِيلِ دَلِيلٌ عَلى أنَّ قِوامَ الدِّينِ الحَنِيفِيِّ عَلى مُخالَفَةِ الأعْداءِ مِن أهْلِ الكِتابِ، وأنَّ فِي مُوافَقَتِهِمْ تَلَفًا لِلدِّينِ

"উল্লেখিত কারণে এ কথার দলিল রয়েছে যে, নিশ্চয় দ্বীনে হানীফে প্রতিষ্ঠিত থাকার অর্থ হলো দ্বীনের শত্রু আহলে কিতাবদের বিরোধিতা করা। আর অবশ্যই দ্বীনের খাতিরে তাদের আনুকূল্যতাকে ঘৃণা করা।"

مرقاة المفاتيح شرح مشكاة المصابيح، ٤/‏١٣٨٧

আবেগের জোরে অনেকেই বলে ফেলে তের/চৌদ্দ ঘন্টা না খেয়ে থেকেছি, আর দুই/তিনটা মিনিট পারবো না? তাদেরকে বলবো, কোন কারণ ছাড়া এই ২/৩ মিনিট অপেক্ষা করলে আপনার সিয়ামের আদৌ কোন উপকার হবে কিনা আল্লাহই ভালো জানেন। তবে ঐ ২/৩ মিনিট অপেক্ষা না করলে আপনার সিয়াম নিশ্চিত দ্বীন বিজয়ের সহযোগী হবে। এবার সিদ্ধান্ত আপনার। তাছাড়া তের/চৌদ্দ ঘন্টা না খেয়ে থেকে দিনশেষে বোকার মতো নিজের পুতঃপবিত্র সিয়ামটাকে ইহুদী খৃষ্টানদের সাথে মিলাতে যাবেন কোন দুঃখে? অথচ আমরা আদিষ্ট হয়েছি ইহুদী-খৃস্টানদের রীতি রেওয়াজের বিরোধিতা করার জন্য। যেমন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন..

 ليس منا من تشبَّهَ بغيرِنا، ولا تشبَّهوا باليهودِ ولا بالنصارى، 

"যে ব্যক্তি অমুসলিমদের সাথে সাদৃশ্য স্থাপন করবে সে আমার উম্মত নয়। কাজেই তোমরা ইহুদী-খৃস্টানদের সাথে সাদৃশ্য স্থাপন করো না।"

السلسلة الصحيحة ٢١٩٤، قوي بالطرق

• দ্রুত ইফতারেই রয়েছে জাতীয় কল্যাণ..

 عن سهل بن سعد الساعدي: أنّ رَسولَ اللهِ ﷺ، قالَ: لا يَزالُ النّاسُ بخَيْرٍ ما عَجَّلُوا الفِطْرَ..

"সাহল বিন সা'দ আস সায়েদী (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন জাতি ততদিন কল্যাণের উপর থাকবে যতদিন তারা দ্রুত ইফতার করবে।"

متفق عليه

একই হাদীস আবু যর গিফারী (রা.) ও সায়িদ ইবনুল মুসাইয়্যাব (রহ.) থেকেও বর্ণিত হয়েছে।হাফেজ ইবনে আব্দির বার (রহ.) বলেন,

أحاديث تعجيل الإفطار وتأخير السّحور صحاحٌ متواترةٌ.

"দ্রুত ইফতার ও দেরিতে সাহুর সংক্রান্ত যাবতীয় হাদীস মুতাওয়াতির পর্যায়ের সহিহ।"

অনেকে দ্রুত ইফতার করাকে সামাজিকতা রক্ষার অন্তরায়ও বলে থাকেন। আরো বলেন, সবাই যেখানে আজানের জন্য অপেক্ষা করছে সেখানে গুটিকয়েক লোক স্রোতের বিপরীতে গিয়ে সূর্য ডুবার সাথে সাথে ইফতার করবে এটা তো ফেতনা! জানিনা সুন্নাহ'র উপর অবিচল থাকলে সেটা ফিতনা কীভাবে হয়।

অথচ, সমস্ত ইমামদের মতে দেরিতে ইফতার করাই হলো ফিতনা। যেমন ইমাম নববী (রহ.) বলেন,

قال النووي : فيه الحث على تعجيل الفطر بعد تحقق غروب الشمس , ومعناه : لا يزال أمر الأمة منتظماً وهم بخير ما داموا محافظين على هذه السنَّة , وإذا أخروه كان ذلك علامة على فسادٍ يقعون فيه

"এ হাদিসে সূর্য ডুবা নিশ্চিত হওয়ার পর অবিলম্বে ইফতার করার প্রতি উৎসাহ রয়েছে। যতদিন উম্মত এ সুন্নাত রক্ষা করে যাবে ততদিন তারা সুশৃঙ্খল থাকবে এবং তারা কল্যাণে থাকবে। যদি তারা ইফতার করতে বিলম্ব করতে থাকে তাহলে সেটা হবে তাদের ফাসাদে লিপ্ত হওয়ার আলামত।"

شرح مسلم ، ٢/٢٠٨

ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেন,

وقال القرطبيّ : إنما كان تعجيل الفطر خيرًا؛ لأنه أحفظ للقوّة، وأرفع للمشقّة، وأوفق للسنّة، وأبعد عن الغلوّ والبدعة، 

"অবশ্যই দ্রুত ইফতার করাতেই রয়েছে কল্যাণ। কেননা এর দ্বারা শক্তি সংরক্ষিত হয়, কষ্ট দূর হয়, সুন্নাহ'র অনুকূলে থাকা যায় এবং অতিরঞ্জন ও বিদআত থেকে দূরে থাক যায়।"

البحر المحيط الثجاج في شرح صحيح الإمام مسلم بن الحجاج، ٢٠/‏٥٦٧

ইমাম মাজেরী (রহ.) বলেন,

قال المازريّ : أشار هذا الحديث إلى أن تغيير هذه السنة عَلَمٌ على فساد الأمر، ولا يزالون بخير ما داموا محافظين عليها

"এই হাদীসটি ঐ কথার দিকে ইঙ্গিত করে যে, দ্রুত ইফতার করার এই সুন্নাহ'কে পরিবর্তন করা হলো ফাসাদ সৃষ্টির আলামত। জাতি যতদিন এই সুন্নাহ'কে হেফাজত করবে ততদিন তারা কল্যাণের মধ্যে থাকবে।"

البحر المحيط الثجاج، ٢٠/٥٦٩

ইমাম ইবনে দাক্বিক্বীল ঈদ (রহ.) বলেন,

قال ابن دقيق العيد : في هذا الحديث ردّ على الشيعة في تأخيرهم الفطر إلى ظهور النجوم، ولعل هذا هو السبب في وجود الخير بتعجيل الفطر؛ لأن الذي يؤخره يدخل في فعل خلاف السنة

"এই হাদীসে শিয়াদের তারকা প্রকাশ পাওয়া পর্যন্ত দেরি করে ইফতার করার খন্ডন রয়েছে। হতে পারে দ্রুত ইফতারে কল্যাণ নিহিত থাকার কারণও এটাই। কেননা যে ব্যক্তি দেরিতে ইফতার করবে সে সুন্নাহ বিরোধী কাজে প্রবেশ করবে।"

البحر المحيط الثجاج، ٢٠/٥٦٩

হাফেজ জালালুদ্দিন সুয়ূতী (রহ.) বলেন,

لما فِيهِ من المُحافظَة على السّنة فَإذا خالفوها إلى البِدْعَة كانَ ذَلِك عَلامَة على إفْساد يقعون فِيهِ

"দ্রুত ইফতার করাতে যখন সুন্নাহ'র হেফাজতের ব্যাপার রয়েছে, সুতরাং এটার বিরোধিতা করে বিদআতের দিকে ধাবিত হওয়াই হলো ফাসাদ সৃষ্টির আলামত, যেখানে তারা নিপতিত হবে।"

شرح السيوطي على مسلم، ٣/‏١٩٨

ইমাম ইবনুল আছীর (রহ.) বলেন,

وقوله: "بخير" الظاهر أنه أشار إلى أن فساد الأمور يتعلق بتغير هذه السنة التي هي تعجيل الفطر، وأن تأخيره ومخالفة السنة في ذلك كالعَلَم على فساد الأمور

"আর কল্যাণের মধ্যে থাকবে কথাটি সুস্পষ্ট এ কথারই ইঙ্গিত যে, ফাসাদ সৃষ্টির সম্পর্ক মুলত দ্রুত ইফতার করার যে সুন্নাহ সেটাকে পরিবর্তন করার সাথে। অবশ্যই ইফতারে দেরি করা ও ইফতারের সুন্নাহ'র বিরোধিতা করা যেন ফাসাদ সৃষ্টির আলামত।"

الشافي في شرح مسند الشافعي، ٣/‏١٩٨

ইমাম মানাভী (রহ.) বলেন,

(لا يزال الناس بخير ما عجلوا الفطر) أي ما داوموا على هذه السنة لأن تعجيله بعد تيقن الغروب من سنن المرسلين فمن حافظ عليه تخلق بأخلاقهم ولأن فيه مخالفة أهل الكتاب في تأخيرهم إلى اشتباك النجوم وفي ملتنا شعار أهل البدع فمن خالفهم واتبع السنة لم يزل بخير

"(লোকেরা ততদিন কল্যাণের উপর থাকবে যতদিন দ্রুত ইফতার করবে) অর্থাৎ তারা এই সুন্নাহ'র উপর অটল থাকবে। কেননা সূর্যের অস্ত যাওয়া নিশ্চিত হবার পর তাড়াতাড়ি ইফতার করে নেয়া হলো প্রত্যেক নবী-রাসুলের সুন্নাত। কাজেই যে ব্যক্তি এই সুন্নাতের হেফাজত করবে সে হবে নববী আদর্শের অধিকারী। কারণ এই সুন্নাহ পালনে আহলে কিতাবরা যে তারকার সংঘর্ষ হওয়া পর্যন্ত দেরি করে সেটার বিরোধিতা রয়েছে। আর ঐ সমস্ত বিদআতীরা যারা এই সুন্নাহ'র বিরোধিতা করবে তারা অবনতির মধ্যে এবং যারা এই সুন্নাহ'র অনুসরণ করবে তারা সর্বদা কল্যাণের মধ্যে থাকবে।"

فيض القدير، ٦/‏٤٥٠

অতএব, দেরিতে ইফতার করাই হলো ফিতনা ও সুন্নাহ বিরোধী কর্মকান্ড। জাতীয় কল্যাণের অন্তরায় ও জমিনে ফাসাদ সৃষ্টির আলামত। জঘন্য বাড়াবাড়ি ও নিকৃষ্ট বিদআত। পক্ষান্তরে দ্রুত ইফতার করাই হলো সুন্নাহ এবং এতেই রয়েছে কল্যাণ।

• সাহাবায়ে কেরামগণ দ্রুত ইফতার করতেন..

 عن عمرو بن ميمون: كانَ أصحابُ محمَّدٍ ﷺ أسرعَ النّاسِ إفطارًا وأبطأَهُم سحورًا.

"আমর বিন মায়মুন (রহ.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন মুহাম্মদ (সা.) এর সাহাবীরা ছিলেন লোকেদের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত ইফতারকারী ও ধীরগতিতে সাহরী আদায়কারী।"

فتح الباري لابن حجر ٤‏/٢٣٤، إسناده صحيح

"দ্রুত ইফতার করা সুন্নাত এ বিষয়ে সবাই একমত।"

الشافي في شرح مسند الشافعي، ٣/‏١٩٨

• দ্রুত ইফতারের তাগিদ দিয়ে ওমর বিন খাত্তাব (রা.) কর্তৃক রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি..

عَنِ الثَّوْرِيِّ، عَنْ طارِقِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، عَنِ ابْنِ المُسَيِّبِ قالَ: كَتَبَ عُمَرُ بْنُ الخَطّابِ إلى أُمَراءِ الأمْصارِ: أنْ لا تَكُونُوا مِنَ المُسَوِّفِينَ بِفِطْرِكُمْ، ولا المُنْتَظِرِينَ بِصَلاتِكُمُ اشْتِباكَ النُّجُومِ

"সায়িদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ওমর বিন খাত্তাব (রা.) বিভিন্ন প্রাদেশিক শাসকদের প্রতি ফরমান জারি করেন এই মর্মে যে, আপনারা ইফতার করার ক্ষেত্রে বিলম্বকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না। আর সালাতে তারকার সংঘর্ষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন না।"

مصنف عبد الرزاق الصنعاني، ٤/‏٢٢٥

• ফারুকে আযম (রা.) লোকেরা দ্রুত ইফতার করে কিনা সেটারও খোঁজখবর রাখতেন..

عَبْدُ الرَّزّاقِ قالَ: أخْبَرَنا مَعْمَرٌ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، عَنِ ابْنِ المُسَيِّبِ، عَنْ أبِيهِ قالَ: كُنْتُ جالِسًا عِنْدَ عُمَرَ إذْ جاءَهُ رَكْبٌ مِنَ الشّامِ فَطَفِقَ عُمَرُ يَسْتَخْبِرُ عَنْ حالِهِمْ، فَقالَ: هَلْ يُعَجِّلُ أهْلُ الشّامِ الفِطْرَ؟ قالَ: نَعَمْ قالَ: «لَنْ يَزالُوا بِخَيْرٍ ما فَعَلُوا ذَلِكَ، ولَمْ يَنْتَظِرُوا النُّجُومَ انْتِظارَ أهْلِ العِراقِ

"সায়িদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি ওমর (রা.) এর মজলিসে বসা ছিলাম। এমতাবস্থায় শামের একজন অশ্বারোহী প্রতিনিধি সেখানে এসে উপস্থিত হন। তারপর ওমর (রা.) তার কাছ থেকে শামবাসীর অবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে আরম্ভ করলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, শামের লোকেরা কি দ্রুত ইফতার করে? ঐ ব্যক্তি বললেন, জ্বি হ্যাঁ। ফারুকে আযম (রা.) বললেন, তারা যতদিন এটা করতে থাকবে ততদিন কল্যাণের মধ্যে থাকবে। আর তারা যেন ইরাকবাসীর মতো তারকার অপেক্ষা না করে।"

مصنف عبد الرزاق الصنعاني، ٤/‏٢٢٥ 

অনেকে ২/৩ মিনিট দেরিতে ইফতার করার পক্ষে নিম্নোক্ত আছারটিও পেশ করে থাকেন।..

أخْبَرَنا مالِكٌ، عَنِ ابْنِ شِهابٍ، عَنْ حُمَيْدِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَوْفٍ، أنَّ عُمَرَ، وعُثْمانَ، كانا يُصَلِّيانِ المَغْرِبَ حِينَ يَنْظُرانِ إلى اللَّيْلِ الأسْوَدِ ثُمَّ يُفْطِرانِ بَعْدَ الصَّلاةِ، وذَلِكَ فِي رَمَضانَ

"ওমর (রা.) ও উসমান (রা.) উভয়ে রমযান মাসে এমন সময় মাগরিবের সালাত আদায় করতেন, যখন তাঁরা কালো অন্ধকার দেখতে পেতেন। এরপর সালাত শেষে ইফতার করতেন।"

مسند الشافعي، ١/‏١٠٤ 

প্রথমত, যারা আছারটিকে দলিল বানিয়েছে তারা নিজেরাই এর উপর আমল করে না। কেননা, তারা কালো অন্ধকার ঘনিয়ে আসলে মাগরিবের সালাত, তারপর ইফতার এভাবে ইফতার করে না। কাজেই এতে তাদের পক্ষে কোন দলিল নেই।

দ্বিতীয়ত, এটি হতে পারে তাঁদের বিশেষ কারণ বশত অনিয়মিত একটি আমল; যা কোনভাবেই অভ্যাসগত নয়। কেননা, কোন খুলাফায়ে রাশেদের পক্ষে এটা সম্ভব নয় যে তাঁরা রাসুলুল্লাহ (রা.) এর সুন্নাহ বিরোধী কোন কাজকে অভ্যাসে পরিনত করবেন। যে কারণে সাহাবীদের কেউ তাঁদের এই আমলের গুরুত্ব দেয়নি।

তৃতীয়ত, এটি সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর আমলের সাথে সাংঘর্ষিক। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) ইফতার না করে কখনো সালাতে যেতেন না।..

حَدَّثَنا حُسَيْنُ بْنُ عَلِيٍّ، عَنْ زائِدَةَ، عَنْ حُمَيْدٍ، عَنْ أنَسٍ، أنَّ النَّبِيَّ ﷺ كانَ لا يُصَلِّي، حَتّى يُفْطِرَ، ولَوْ بِشَرْبَةٍ مِن ماءٍ

"আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, নিশ্চয় নবী (সা.) ইফতার না করা পর্যন্ত সালাত আদায় করতেন না। একটু পানি পান করে হলেও আগে ইফতার সেরে নিতেন।"

مصنف ابن أبي شيبة، ٩٧٨٩

চতুর্থত, হতে পারে তাঁদের এই আমল দ্বারা এ কথা বুঝানো উদ্দেশ্য যে, তাড়াতাড়ি ইফতার করা ওয়াজিব নয় এবং বিশেষ কোন ওজর বশত দেরিও করা যেতে পারে। তবে তাতে কোন ফযিলত নেই। যেমন ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন,

كَأنَّهُما يَرَيانِ تَأْخِيرَ ذَلِكَ واسِعًا، لا أنَّهُما يَعْمَدانِ الفَضْلَ لِتَرْكِهِ بَعْدَ أنْ أُبِيحَ لَهُما، وصارا مُفْطِرَيْنِ بِغَيْرِ أكَلٍ وشُرْبٍ، لِأنَّ الصَّوْمَ لا يَصْلُحُ فِي اللَّيْلِ،

"তাঁরা বুঝাতে চেয়েছেন দেরি করাতে প্রশস্ততা রয়েছে (অর্থাৎ বিশেষ কারণ বশত দেরি করা যেতে পারে)। তবে এমন নয় যে তাঁদের (দ্রুত ইফতারের) সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তাঁরা এটাকে ফযিলতের আশায় ইচ্ছাকৃত ছেড়ে দিয়েছেন এবং কোন পানাহার ছাড়াই তারা ইফতার করেছেন। কারণ রাতের বেলা সিয়াম শুদ্ধ নয়।"

معرفة السنن والآثار، ٦/‏٢٨٦ 

তিনি তাঁর কিতাবুল উমে আরো বলেন,

ولا يُكْرَهُ تَأْخِيرُهُ إلّا لِمَن تَعَمَّدَهُ ورَأى الفَضْلَ فِيهِ ومُقْتَضاهُ أنَّ التَّأْخِيرَ لا يُكْرَهُ مُطْلَقًا

"ইফতারে দেরি করা তার জন্য মাকরুহ হবে যে এটাতে ফযিলত আছে মনে করে ইচ্ছাকৃত দেরি করবে। যদিও দেরি করাতে সাধারণত মাকরূহ না হওয়ারই দাবি রাখে।"

فتح الباري لابن حجر، ٤/‏١٩٩

তবে ইমাম শাফেয়ী (রহ.) এর উক্ত বক্তব্যকে রদ করে শায়খ মুহাম্মদ আদম আল আছয়ুভী বলেন,

وفيه نظر لا يخفى؛ إذ كونه مكروهًا هو الذي دلّ عليه ظاهر النصّ؛ لأنه نصّ على أن التعجيل فيه مخالفة لليهود والنصارى، كما سلف من حديث أبي هريرة ، وقد أُمِر -ﷺ- بمخالفتهم..  وفي تأخير الفطر موافقة لهم، ومخالفة لهديه -ﷺ-، فكيف يقال: إنه غير مكروه؟ بل الذي يظهر من النصوص المذكورة التحريم، فتأمّل بالإنصاف.

"এতে যে আপত্তি রয়েছে একথা গোপন নয়। যখন এটি মাকরূহ হওয়া সুস্পষ্ট নস দ্বারা সাব্যস্ত, কেননা নস এ কথার উপর প্রতিষ্ঠিত যে দ্রুত ইফতার করার অর্থ হলো ইহুদী-খৃস্টানদের বিরোধিতা করা, যেমনটা আবু হুরায়রা (রা.) এর হাদীসে গত হয়েছে, আর রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন তাদের বিরোধিতা করার জন্য, এছাড়াও যখন ইফতার দেরি করাতে ইহুদী-খৃস্টানের মুয়াফেক ও রাসুলুল্লাহ (সা.) এর নির্দেশের মুখালেফ হয়, তখন কীভাবে বলা যায় এটি মাকরূহ নয়? বরং এটি উল্লেখিত নস দ্বারা সুস্পষ্ট হারাম হওয়ার দাবি রাখে। অতএব ইনসাফের সহিত বিবেচনা করুন।"

البحر المحيط الثجاج في شرح صحيح الإمام مسلم بن الحجاج، ٢٠/‏٥٦٨ 

ইমাম মোল্লা আলী ক্বারী (রহ.) বলেন,

فَهُوَ لِبَيانِ جَوازِ التَّأْخِيرِ لِئَلّا يُظَنَّ وُجُوبُ التَّعْجِيلِ

"তাঁরা এটি করেছেন মুলত (ওজর বশত) বিলম্বে ইফতার জায়েয হওয়া বুঝাতে। যাতে লোকেরা দ্রুত ইফতার করাকে ওয়াজিব মনে না করে।"

مرقاة المفاتيح ، ٤/‏١٣٨٥  

ইমাম মাওয়ারদী (রহ.) বলেন,

بِأنَّهُما أرادا بَيانَ جَوازِ ذَلِكَ لِئَلّا يُظَنَّ وُجُوبُ التَّعْجِيلِ

"তাঁরা উভয়ে এ কথা বুঝাতে চেয়েছেন যে (ওজর বশত) এটা জায়েয। যাতে লোকেরা এটাকে ওয়াজিব মনে না করে।"

المجموع شرح المهذب، ٦/٣٦٢

পঞ্চমত, আলোচ্য আছারটি দলিলের উপযুক্তই নয়। কেননা একদিকে আছারটি মুনকাতি। অন্যদিকে উক্ত আছারের বুনিয়াদি রাবী হুমায়দ বিন আব্দুর রহমান (রহ.) থেকেই এ বিষয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত বর্ণনা পাওয়া যায়। যেখানে বলা হয়েছে ফারুকে আযম (রা.) ও জিন্নুরাইন (রা.) উভয়ে সালাতের পূর্বেই ইফতার করতেন। যেমন..

حَدَّثَنا عَبْدُ الأعْلى، عَنْ مَعْمَرٍ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، عَنْ حُمَيْدِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، أنَّ عُمَرَ، وعُثْمانَ، كانا يُصَلِّيانِ المَغْرِبَ إذا رَأيا اللَّيْلَ، كانا يُفْطِرانِ قَبْلَ أنْ يُصَلِّيا

"নিশ্চয় ওমর বিন খাত্তাব (রা.) ও উসমান বিন আফ্ফান (রা.) উভয়ে অন্ধকার দেখলেই মাগরিবের সালাত আদায় করতেন। তাঁরা উভয়ে সালাতের আগে ইফতার করতেন।"

مصنف ابن أبي شيبة، ٩٧٩٢

এছাড়াও উপরে উল্লেখ করেছি, ওমর বিন খাত্তাব (রা.) দ্রুত ইফতার করার জন্য বিভিন্ন প্রাদেশিক শাসকদের প্রতি রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করতেন। পাশাপাশি লোকেরা দ্রুত ইফতার করে কিনা সে বিষয়েও তিনি খোঁজখবর রাখতেন। কাজেই ফারুকে আযম (রা.) এর মাগরিব পড়ে ইফতার করার ঘটনা সত্য হলেও সেটা কোনভাবেই তাঁর অভ্যাসগত ছিল না। 

• দ্রুত ইফতারের হেকমত..

১। সুন্নাহ'র অনুসরণ করা।

২। নববী আদর্শ ধারণ করা।

৩। ইহুদী-খৃস্টানদের বিরোধিতা করা।

৪। রাফেযীদের রদ করা।

৫। হুদুদে শরিয়ার উপর অটল থাকা।

৬। সিয়ামের সাথে সখ্যতা স্থাপন করা।

৭। যথাসময়ে হালাল নিয়ামত ভোগ করা।

৮। কল্যাণের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা।

৯। দ্বীন বিজয়ে সহযোগিতা করা।

১০। ইবাদতের জন্য দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করা।

• ফিতনার যুগে সুন্নাহ'কে আঁকড়ে ধরলে বিনিময়ে একশ শহীদের সওয়াব..

عن أبي هريرة: من تمسَّكَ بسنَّتي عندَ فسادِ أمَّتي فلهُ أجرُ مئة شهيدٍ.

"আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার উম্মতের বিপর্যয়ের সময় আমার সুন্নাতকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে, তার জন্য রয়েছে একশত শাহীদের সাওয়াব।"

مشكاة المصابيح، ١‏/١٣٦

• কারোর কথায় সুন্নাহ পরিত্যাগ করা যাবে না..

 قالَ علي بن أبي طالب : ما كُنْتُ لأدَعَ سُنَّةَ النبيِّ ﷺ لِقَوْلِ أحَدٍ..

"আলী ইবনে আবি তালেব (রা.) বলেন, কারোর কথায় আমি নবী (সা.) এর সুন্নাহ পরিহার করতে পারবো না।"

صحيح البخاري ١٥٦٣  

সারকথাঃ রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নাহ'র বিপরীতে তথাকথিত মনুষ্য তৈরি সতর্কতার কোন মূল্য নেই। বরং এটি একটি সম্পূর্ণ শয়তানী ওয়াসওয়াসা, যা থেকে প্রত্যেক মুসলমানের বেঁচে থাকা জরুরী। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।

Saturday, May 16, 2020

টাকা দিয়ে ফিতরা আদায়ের মর্মে দলীল গুলোর তাহক্বীক্ব

টাকা দিয়ে ফিতরা আদায়ের মর্মে দলীল গুলোর তাহক্বীক্ব।
তাহক্বীক্ব:- মুসলেহুদ্দীন মাযহারী

আসসালামুয়ালাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
প্রিয় পাঠক! বর্তমানে ফিতরা নিয়ে সর্বত্র ফিতনা পরিলক্ষিত হচ্ছে।
আমরা সকলেই জানি যে,নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম রাঃ খাদ্য দ্রব্য দিয়েই ফিতরা আদায় করেছেন। যদিও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে টাকা বিদ্যমান ছিল।
ফিতরার বিধান হচ্ছে ফরয।আর এটা একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত আর ইবাদত করতে হবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রদর্শিত পদ্ধতিতে।
সম্মানিত পাঠক!
যে সমস্ত উলামায়ে কেরাম বন্ধুরা টাকা দিয়ে ফিতরা দেওয়ার মর্মে দলীল গুলো উপস্থাপন করেন অবশ্যই সেগুলোর অবস্থা জেনে নেওয়া আবশ্যক।
কারণ:- এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত আর যঈফ হাদীস! যঈফ হাদীস কোন ক্ষেত্রেই আমলযোগ্য নয়।
নিম্নে টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় সংক্রান্ত দলীল গুলোর তাহক্বীক্ব করার আগেই বলে রাখি টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় মর্মে একটিও সহীহ হাদীস নেই।

প্রথম যেই দলীল উপস্থাপন করেন সেটি হলো সহীহুল বুখারীতে বর্ণিত একটি মুআল্লাক্ব হাদীস।
দেখা যাক সেই দলীলের অবস্থা।
বুখারীতে সানাদবিহীন ইমাম বুখারী রহঃ উল্লেখ করেছেন।
দেখুন
প্রথম দলীল:-
كتاب الزكاة
باب العرض في الزكاة
قال طاوس قال معاذ لأهل اليمن ائتوني بعرض ثياب خميص أو لبس في الصدقة مكان الشعير والذرة أهون عليكم وخير لاصحاب النبي بالمدينة
কিতাবুয যাকাত।
অধ্যায়:- পণ্যের যাকাত।
অর্থাৎ:- ত্বঊস রহঃ বলেন,মুআয বিন জাবাল রাঃ ইয়ামানবাসীদেরকে বললেন, তোমরা যব ও ভুট্টার পরিবর্তে চাদর ও পরিধেয় বস্ত্র আমার কাছে যাকাত স্বরূপ নিয়ে এসো।ওটা তোমাদের পক্ষেও সহজ এবং মদীনায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের জন্যও উত্তম।

তাখরীজ:- সহীহুল বুখারী ২/১১৬ সুনানুদ দারাক্বুতনী ২/৪৮৭ হাদীস নং ১৯৩০ আস সুনানুল কুবরা হাদীস নং ৭৩৭৩ মা'রিফাতুস সুনানি অল আসার হাদীস নং ১৩২৮৪ শারহুস সুন্নাহ লিল বাগাবী ৬/১২ পৃষ্ঠা।

তাহক্বীক্ব:- এই হাদীস যঈফ।

কারণ:- এই হাদীসের সানাদে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে।
এই হাদীসের সানাদে ত্বঊস মুআয রাঃ থেকে বর্ণনা করেছেন।যদিও ত্বঊস মুআয রাঃ থেকে শোনেননি।
ইবনু হাজার আস্কালানী রহঃ বলেন,তাঊস মুআয রাঃ থেকে শোনেননি ( ফাতহুল বারী ১/১৮)।
অনুরূপ কথাই বলছেন ইমাম ক্বাসতালানী ( ইরশাদুশ সারী ১/২৭)।
এই আসারটি যে সমস্ত গ্রন্থে বিচ্ছিন্ন বলা হয়েছে, সেগুলো হলো:-
(ইতহাফুল মাহারাহ লিইবনি হাজার হাদীস নং ১৬৬৫৫ তাগলীক্বুত তা'লীক্ব ৩/১৩ রাওযাতুল মুহাদ্দিসীন হাদীস নং ৬১৩)।
প্রকাশ থাকে যে, এই হাদীস ফিতরা সংক্রান্ত আদৌ নয়। যদিও এই যঈফ আসার থেকে টাকা নয় বরং কাপড় যাকাতের কথা উল্লেখ আছে।
মারে ঘুটনা ফূটে সার।
দ্বিতীয় দলীল:-
حدثنا جرير بن عبد الحميد عن ليث عن عطاء أن عمر كان يأخذ العروض في الصدقة من الورق و غيرها
অর্থাৎ:- নিশ্চয় উমার রাঃ পণ্যদ্রব্য রৌপ্য থেকে এছাড়াও অন্যান্য জিনিস থেকে সাদাকাহ নিতেন।

তাখরীজ:-
( মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ হাদীস নং ২/৪০৪ হাদীস নং ১০৪৩৮ জামিউল আহাদীস হাদীস নং ২৯০৬২ কানযুল উম্মাল হাদীস নং ১৭০৮১)।

তাহক্বীক্ব:-
হাদীস যঈফ।
কারণ:- এই হাদীসের সানাদে "লাইস বিন আবী সুলাইম" যঈফ ( আত ত্ববাক্বাতুল কুবরা ১/১২৯ তারীখু ইবনু মাঈন ১/১৫৮ রাবী নং ৫৬০ আহওয়ালুর রিজাল ১/১৪৯ জীবনী নং ১৩২ আয যুআফা অল মাতরূকূন লিন নাসাঈ ১/৯০ রাবী নং ৫১১ আল জারহু অত তা'দীল ৭/১৭৯ আল মাজরূহীন লিইবনি হিব্বান ২/২৩২)।

সে মাতরূকুল হাদীস ( আল কুনা অল আসমা লিইমাম মুসলিম ১/৪১)।
প্রকাশ থাকে যে, এই হাদীসে স্পষ্ট নেই যে, এটা ফিতরা সংক্রান্ত।

তৃতীয় দলীল:-
حدثنا أبو أسامة عن زهير قال سمعت أبا إسحاق يقول ادركتهم وهم يعطون في صدقة رمضان الدراهم بقيمة الطعام.
তাখরীজ:-

অর্থাৎ:- যুহাইর বলেন,আমি আবূ ইসহাক্ব আস সাবিঈকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন,আমি তাদের ( তাবিয়ী) এই অবস্থায় পেয়েছি যে, তাঁরা রমাযানে সাদাকায়ে ফিতর খাদ্যের বিনিময়ে টাকা দ্বারা আদায় করতেন ( মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ ২/৩৯৮ হাদীস নং ১০৩৭১)।

তাহক্বীক্ব:- এই হাদীস যঈফ।
কারণ:- এই হাদীসের সানাদে " আবু ইসহাক আস সাবিঈ" এর শেষ জীবনে মস্তিষ্ক বিকৃতি হয়েছিল।
আর তাঁর থেকে " যুহাইর বিন মুআবিয়াহ" মস্তিষ্ক বিকৃতির পর শুনেছেন।
যে সমস্ত মুহাদ্দিসীনে কিরাম "আবূ ইসহাক্ব আস সাবিঈ"এর শেষ জীবনে মস্তিষ্ক বিকৃতি হয়েছিল বলেছেন তাদের নাম নিচে উল্লেখ করা হলো।

১) মুহাদ্দিস ইমাম ইবনে সা'দ মৃত ২৩০ হিজরী বলেন,
ابو إسحاق السبيعي متوفي سنة ١٢٩ه‍ ثقة عابد اختلط بآخره ( الطبقات الكبرى لابن سعد ١/٢٤٠)
আবূ ইসহাক্ব আস সাবিঈ মৃত ১২৯ হিজরী বিশ্বস্ত আবিদ ছিলেন। তাঁর শেষ জীবনে মস্তিষ্ক বিকৃতি হয়েছিল ( ত্ববাক্বাতুল কুবরা ১/২৪০)।

২) ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন রহঃ মৃত ২৩৩ হিজরী বলেন,
وقال يحي بن معين سمعت حميد الرؤاسي يقول: إنما سمع إبن عيينة من أبي إسحاق بعد ما اختلط ( المختلطين للعلائ ١/٩٣ راوي/٣٥).
ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন রহঃ বলেন, আমি হুমাইদ আর রাওয়াসী রহঃ কে বলতে শুনেছি, নিশ্চয় ইবনে উয়াইনাহ আবূ ইসহাক্ব আস সাবিঈ থেকে মস্তিষ্ক বিকৃতির পর শুনেছেন ( আল মুখতালিত্বীন লিল আলায়ী ১/৯৩ রাবী নং ৩৫)।

৩) আল্লামা ইমাম ইজলী রহঃ মৃত ২৬১হিজরী বলেন,
زهير بن معاوية وكان راويه عن أبي إسحاق السبيعي ويقول: إنه إنما سمع منه بآخره( الثقات للعجلي ١/١٦٦ راوي/٤٦٥)
যুহাইর বিন মুআবিয়াহ আবূ ইসহাক্ব আস সাবিঈ থেকে শেষে শুনেছেন (আস সিক্বাত লিল ইজলী ১/১৬৬ রাবী নং ৪৬৫)।

৪) আবূ যুরআহ আর রাযী রহঃ মৃত ২৬৪ হিজরী বলেন,
زهير بن معاوية : إنه سمع من أبي إسحاق بعد الاختلاط (المختلطين للعلائ ١/٩٣ ترجمة ٣٥).
যুহাইর বিন মুআবিয়াহ: নিশ্চয় সে আবু ইসহাক থেকে মস্তিষ্ক বিকৃতি হওয়ার পর শুনেছেন ( আল মুখতালিত্বীন লিল আলায়ী ১/৯৩ রাবী নং ৩৫)।

৫) ইমাম আবু দাউদ আসসাজিস্তানী মৃত ২৭৫ হিজরী বলেন,
ابو إسحاق اختلط بآخره
( سوالات أبي عبيد الاجري أبا داود السجستاني في الجرح والتعديل ١/١٠٦).
আবু ইসহাক আস সাবিইর শেষ জীবনে মস্তিষ্ক বিকৃতি হয়েছিল ( সাওয়ালাত আবী উবায়দিল্লাহ আল আজুর্রী আবা দাউদ ফিল জারহি অত তা'দীল ১/১০৬)।

৬) ইমাম ইবনু আবী হাতিম রহঃ মৃত ৩২৭হিজরী বলেন,
سئل أبو زرعة عن زهير بن معاوية فقال ثقة إلا أنه سمع من أبي إسحاق بعد الاختلاط ( الجرح والتعديل ٣/٥٨٩)
আবূ যুরআহকে যুহাইর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি বলেন,সে বিশ্বস্ত কিন্তু আবূ ইসহাক্ব থেকে মস্তিষ্ক বিকৃতি হওয়ার পর শুনেছেন ( আল জারহু অত তা'দীল লিইবনি আবী হাতিম ৩/৫৮৯)।

৭) ইমাম ক্বুরতুবী আল বাজী আল উন্দুলুসী মৃত ৪৭৪ বলেন,
قال أبو زرعة الرازي زهير بن معاوية ثقة إلا أنه سمع من أبي إسحاق بعد الاختلاط( التعديل والتجريح لمن خرج له البخاري في الجامع الصحيح ٢/٥٩٦ تحقيق أبو لبابة حسين )
আবূ যুরআহ বলেন,যুহাইর বিন মুআবিয়াহ বিশ্বস্ত কিন্তু আবূ ইসহাক্ব আস সাবিঈ থেকে মস্তিষ্ক বিকৃতির পর শুনেছেন ( আত তা'দীল অত তাজরীহ লিমান খার্রাজা লাহুল বুখারী ফিল জামিইস সাহীহ ২/৫৯৬)।

৮) ইবনুস স্বলাহ রহঃ মৃত ৬৪৩ হিজরী বলেন,আবূ ইসহাক্ব আস সাবিইর মস্তিষ্ক বিকৃতি হয়েছিল ( আল ইগতিবাত বিমান রমা মিনার রুআত বিল ইখতিলাত লিইবনিল আজমী মৃত ৮৪১ ১/২৭৩ রাবী নং ৮০ মুক্বাদ্দামাহ ইবনুস স্বলাহ,মা'রিফাতু আনওয়াঈ উলূমিল হাদীস ১/৩৯২ তাহক্বীক্ব নূরুদ্দীন ইতর রহঃ)।
৯) আল্লামাহ ইমাম নববী রহঃ মৃত ৬৭৬ হিজরী বলেন,
فيقبل ما روي عنهم قبل الاختلاط ولا يقبل ما بعده.........سماع عيينة منه بعد اختلاطه ( التقريب والتيسر النووي ١/١٢٠).
ইখতিলাতের আগে বর্ণনা করলে গ্রহণযোগ্য আর ইখতিলাতের পর করলে গ্রহণযোগ্য নয়।
সুফয়ান ইবনে উয়াইনাহ (আবূ ইসহাক্ব) তার থেকে তার মস্তিষ্ক বিকৃতির পর শুনেছেন ( আত তাক্বরীব অত তাইসীর লিন নববী ১/১২০ তাদরীবুর রাবী ফী শারহি তাক্বরীবিন নববী ২/৮৯৫)।

১০) আল্লামাহ ইমাম ইরাক্বী মৃত ৮০৬ হিজরী বলেন,
أبو إسحاق السبيعي اختلط( شرح التبصرة والتذكرة ألفية للعراقي ٢/٣٣١ التقييد والايضاح شرح مقدمة ابن الصلاح ١/٤٤٥).
আবূ ইসহাক্ব আস সাবিইর মস্তিষ্ক বিকৃতি হয়েছিল ( শারহুত তাবসিরাহ অত তাযকিরাহ আলফিয়্যাহ লিল ইরাক্বী ২/৩৩১ আত তাক্বয়ীদ অল ঈযাহ শারহ মুক্বাদ্দামাহ ইবনিস স্বলাহ ১/৪৪৫)।

১১) ইবনু হাজার আস্কালানী রহঃ মৃত ৮৫২ হিজরী বলেন,
عمرو بن عبد الله الهمداني أبو إسحاق السبيعي ثقة عابد،من الثالثة اختلط بآخره( تقريب التهذيب جزء الثاني رقم الصفحة ٧٩ ترجمة ٥٦٩٧ تحقيق الشيخ خليل مأمون شيحا تقريب التهذيب ١/٤٢٣ راوي ٥٠٦٥).
আমর বিন আব্দিল্লাহ আল হামদানী আবূ ইসহাক্ব আস সাবিঈ বিশ্বস্ত,তৃতীয় স্তরের শেষ জীবনে মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছিল ( তাক্বরীবুত তাহযীব ২/৭৯ জীবনী নং ৫৬৯৭ তাক্বরীবুত তাহযীব ১/৪২৩ রাবী নং ৫০৬৫)।

১২,১৩) শায়খ আব্দুল কাদির আল আরনাউত রহঃ ও শায়খ আয়মান স্বলেহ শা'বান রহঃ বলেন,আবূ ইসহাক্ব আস সাবিইর শেষ জীবনে মস্তিষ্ক বিকৃতি হয়েছিল ( তাহক্বীক্ব ও তা'লীক্ব জামিউল উসূল ২/৪২৪ ইবনুল আসীর মৃত ৬০৬ হিজরী)।

১৪) আল্লামাহ আব্দুর রহমান মুবারকপুরী রহঃ মৃত ১৩৫৩ হিজরী বলেন,
وهو مدلس وقد اختلط بآخره( تحفة الاحوذي ٥/٤٣١).
তিনি মুদাল্লিস এবং শেষ জীবনে মস্তিষ্ক বিকৃতি হয়েছিল ( তুহফাতুল আহওয়াযী ৫/৪৩১)।

১৫) আল্লামাহ নাসিরুদ্দীন আলবানী রহঃ মৃত ১৪২০ হিজরী বলেন,
أبو إسحاق السبيعي وهو ثقة ولكنه مدلس مختلط ( سلسلة الأحاديث الضعيفة ١٢/٤١٢).
আবূ ইসহাক্ব আস সাবিঈ বিশ্বস্ত কিন্তু তিনি মুদাল্লিস মস্তিষ্ক বিকৃত ছিলেন ( সিলসিলাতুল আহাদীয যঈফাহ ১২/৪১২)।
এছাড়াও তিনি বলেন,শু'বাহ এর বর্ণনা সুরক্ষিত কেননা তিনি তাঁর মস্তিষ্ক বিকৃতি হওয়ার পূর্বে শুনেছেন ( আত তা'লীক্বাতুল হিসান আলা সহীহ ইবনি হিব্বান ১০/১৬১ হাদীস নং ৭০২৩ এর তাহক্বীক্ব)।
এ ছাড়াও সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহাহ এর একটি আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, তাঁর মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছিল ( সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহাহ ৫/৮৭ হাদীস নং ২০৫৫ এর আলোচনা দ্রষ্টব্য)।

১৬) শায়খ শুআইব আল আরনাউত রহঃ মৃত ১৪৩৮ হিজরী বলেন,
فإن زهير بن معاوية سمع من أبي إسحاق بعد الاختلاط( مسند احمد الرسالة ١٨/٤١٠ مسند احمد ٢/١٧٤).
নিশ্চয়ই যুহাইর বিন মুআবিয়াহ আবূ ইসহাক্ব আস সাবিঈ থেকে মস্তিষ্ক বিকৃতির পর শুনেছেন ( মুসনাদ আহমাদ আর রিসালাহ ১৮/৪১০ মুসনাদ আহমাদ ২/১৭৪)।

প্রিয় পাঠক:- লেখনীর কলেবর বৃদ্ধি না করে আরো যে সমস্ত গ্রন্থে আবূ ইসহাক্ব আস সাবিইর মস্তিষ্ক বিকৃতির কথা উল্লেখিত হয়েছে সেগুলোর উদ্ধৃতি উপস্থাপন করলাম।
আপনারা মিলিয়ে দেখতে পারেন।
( আল মু'জামুস সাগীর লিত ত্ববারী ২/৭০৫ ,শারহু সহীহ মুসলিম হাসান আবুল আশবাল ৫/৯৪ ,আত তাম্বীহাতুল মুজমিলাহ আলাল মাওয়াযিইল মুশকিলাহ লিল আলায়ী ১/৭১ তাহক্বীক্ব মারযুক্ব বিন হায়্যাস আলে মারযূক্ব আল অহরানী, শারহুল মওক্বিযাহ লিয যাহাবী ১/১৫৩ তাহক্বীক্ব আবুল মুনযির মাহমূদ বিন মুহাম্মাদ বিন মুস্তাফা বিন আব্দুল লতীফ আল মানয়াবী,মিসবাহুয যুজাজাহ ফী যওয়াইদী ইবনি মাজাহ ১/১২৫, সওয়ালাত আল বারক্বানী লিদ দারিক্বুতনী মৃত ৪২৫ হিজরী ১/৫২ তাহকীক মাজদী আস সাইয়্যিদ ইব্রাহীম,শারহু ইখতিসারি উলূমিল হাদীস লি ইব্রাহিম বিন আব্দিল্লাহ ১/৪৪৪ মাওক্বিউল ইসলাম সওয়াল ও জওয়াব ১/৪১৮ ইত্যাদি)।
এছাড়াও অনেক রয়েছে।

প্রিয় পাঠক!
এবারে আলোচনা করবো ইমাম যাহাবী রহঃ মৃত ৭৪৮ হিজরী।
তিনি বলেছেন,
عمرو بن عبد الله أبو إسحاق السبيعي من أئمة التابعين بالكوفة واثباتهم إلا أنه شاخ ونسي ولم يختلط.وقد سمع منه سفيان بن عيينة وقد تغير قليلاً( ميزان الاعتدال ٣/٢٧٠ ).
আমর বিন আব্দিল্লাহ আবু ইসহাক আস সাবিঈ তাবিয়ী কূফী বিশ্বস্ত কিন্তু তিনি বার্ধক্য হয়ে গিয়েছিলেন এবং ভ্রম হতো মস্তিষ্ক বিকৃতি হয়নি এবং সুফয়ান ইবনে উয়াইনাহ তাঁর থেকে অল্প পরিবর্তন শুনেছেন ( মীযানুল ই'তিদাল ৩/২৭০)।

উক্ত উক্তি থেকে বুঝা গেল যে,ইমাম যাহাবী রহঃ এর নিকট তাঁর মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেনি।
আর এই উক্তি নকল করে অনেকেই লম্বা চওড়া উদ্ধৃতি দিয়ে থাকেন যা আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়।
ইমাম যাহাবী রহঃ হলেন,মুতাআখ্খিরীন আর উপরে অধিকাংশ মুহাদ্দিস যারা মুতাক্বাদ্দিমীন ও মুতাআখ্খিরীন সকলেই বলেছেন আবূ ইসহাক্ব আস সাবিইর মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছিল।আর যুহাইর বিন মুআবিয়াহ মস্তিষ্ক বিকৃতি হওয়ার পর শুনেছেন।
অতএব ইমাম যাহাবী রহঃ এর কথা সঠিক নয়।
তবুও তিনি স্মৃতিভ্রমের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
যে সমস্ত মুহাক্বিক্ব ইমাম যাহাবী রহঃ এর বই গুলো তাহক্বীক্ব করেছেন তাঁরা সকলেই মস্তিষ্ক বিকৃতি হয়েছিল এটাই উল্লেখ করেছেন।
যেমন,
( সিয়ারু আলামিন নুবালা ৩/১৩১ মান তাকাল্লামা ফীহি অহুয়া মু'সিক্ব ১/৫৬৯ শারহুল মওক্বিযাহ লিয যাহাবী ১/১৫৩ )।

এবারে আসুন উসূলের দিকে।
জমহুর বা অধিকাংশ মুহাদ্দিসীনে কিরাম মস্তিষ্ক বিকৃতি হয়েছিল বলেছেন আর ইমাম যাহাবী রহঃ বলেছেন মস্তিষ্ক বিকৃতি হয়নি।
এই অবস্থায় কার কথা গ্রহণযোগ্য হবে?
এবারে দেখুন উসূল বা নীতিমালা কি বলে।

আব্দুল অহ্হাব বিন তাক্বিউদ্দীন আস সুবকী রহঃ মৃত ৭৭১ হিজরী।
তিনি ইজমা নকল করেছেন যে,
যখন জারাহ বা ত্রুটি বর্ণনাকারীদের সংখ্যা বেশি হবে তখন জারাহ প্রাধান্য পাবে।
إن عدد الجارح إذا كان أكثر قدم الجرح إجماعا ( قاعدة في الجرح والتعديل
নিশ্চয় জারাহকারীদের সংখ্যা বেশি হলে সর্বসম্মতিক্রমে জারাহ প্রাধান্য পাবে ( ক্বায়িদাহ ফিল জারহি অত তা'দীল ১/৫৭)।
এই সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন
ক্বাওয়াইদুত তাহদীস মিন ফুনূনী মুসত্বলাহিল হাদীস
১/১৮৮ ফাতহুল বাক্বী বিশারহি আলফিয়্যাতিল ইরাক্বী ১/৩১১)।
অতএব এই হাদীস যঈফ। কারণ অধিকাংশ মুহাদ্দিস আবূ ইসহাক্ব আস সাবিঈ কে মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছিল বলেছেন আর যুহাইর বিন মুআবিয়াহ মস্তিষ্ক বিকৃতির পর শুনেছেন।
এই হাদীস আবূ ইসহাক্ব আস সাবিঈ থেকে আর কেউ শুনেনি আর এর কোন সানাদ নেই।
এবারে প্রিয় পাঠক আরো একটি উসূল দেখে নিন।

ডঃ মাহমূদ আত তহ্হান রহঃ বলেন,
وما حدث به بعد الاختلاط: فمردود
ইখতিলাত বা মস্তিষ্ক বিকৃতির পর যা বর্ণনা করবে তা প্রত্যাখ্যাত ( তাইসীরু মুসত্বলাহিল হাদীস ১৫৫ পৃষ্ঠা)।
ইমাম নববী রহঃ একই কথা বলেছেন,
ولا يقبل ما بعده
মস্তিষ্ক বিকৃতির পর বর্ণনা করলে গ্রহণীয় নয় ( আত তাক্বরীব অত তাইসীর লিন নববী ১/১২০)।

এবারে একটি সংশয় এবং তার নিরসন।
ইবনু হাজার আসক্বালানী রহঃ বলেছেন,
قال إبن حجر: لم أر في البخاري من الرواية عنه إلا عن القدماء( فتح الباري ١/٤٣١).

ইমাম বুখারী স্বীয় সহীহতে ( আবূ ইসহাক্ব সূত্রে) কারোরই হাদীস সন্নিবেশিত করেননি ক্বাদীমুস সিমা বা ইখতিলাত বা মস্তিষ্ক বিকৃতির আগের ব্যতীত( ফাতহুল বারী ১/৪৩১)।
এটা ইবনে হাজার আসক্বালানী রহঃ এর ভুল হয়েছে।
কারণ:- তিনি নিজেই আবূ ইসহাক্ব আস সাবিঈ কে মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছিল বলেছেন ( তাক্বরীবুত তাহযীব ১/৪২৩ রাবী নং ৫০৬৫)।
আর যুহাইর বিন মুআবিয়াহ মস্তিষ্ক বিকৃতির পর শুনেছেন এটা প্রমাণিত।
আর ইমাম বুখারী রহঃ যুহাইর বিন মুআবিয়াহ সূত্রে একাধিক হাদীস বর্ণনা করেছেন।
যেমন,
( সহীহুল বুখারী হাদীস নং ২৭৩৯,৩৬১৫ এবং ৪৯০৩)।
সহীহ মুসলিমেও আছে ।
যেমন,
( সহীহ মুসলিম হাদীস নং ১৬৮৭ ,৪৯৭৬)।
ইবনু হাজার আস্কালানী রহঃ এর এই কথা ভুল।
বিস্তারিত জানতে দেখুন,
শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী রহঃ আলোচনা করেছেন ( সিলসিলাতুল আহাদীয যঈফাহ ১০/৩৮৮-৩৯১ পৃষ্ঠা)।
এবারে প্রশ্ন হলো যে,
যুহাইর বিন মুআবিয়াহ মস্তিষ্ক বিকৃতির পর শুনেছেন তারপরও সহীহাইন অর্থাৎ বুখারী মুসলিমে কেন?
বুখারী মুসলিমে আবূ ইসহাক্ব আস সাবিঈ থেকে যুহাইর বিন মুআবিয়াহ বর্ণনা করলেও সেটা যঈফ নয়।
এর উত্তর জানতে এই বই দুটি পড়ুন:
১) আল কাওয়াকিবুন নায়্যিরাত বিইবনিল কায়্যাল মৃত ৯৩৯ হিজরী।
২) মারবিয়্যাতুল মুখতালিতীন ফিস সহীহায়ন ডঃ জাসিম মুহাম্মদ রাশিদ ঈসাবী রহঃ।

যারা বলেন, এই আসারে হুম (هم) এর অর্থ সাহাবী তাঁদের কাছে আমি একজন সাহাবীর নাম জানতে চাই,যিনি টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় করেছেন।
যদিও এই আসার যঈফ।

চতুর্থ দলীল:-
حدثنا وكيع عن سفيان عن هشام عن الحسن ( البصري) قال لا بأس أن تعطي الدراهم في صدقة الفطر.
অর্থাৎ:- হাসান বাসারী রহঃ বলেন, টাকা দ্বারা সাদাক্বাতুল ফিতর আদায় করা কোন সমস্যা নেই ( মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ হাদীস নং ১০৩৭০)।

তাহক্বীক্ব:- এই হাদীস যঈফ।
কারণ:- উক্ত হাদীসের সানাদে " সুফয়ান আস সাওরী" প্রসিদ্ধ মুদাল্লিস ( আসমাউল মুদাল্লিসীন ১/৫১ রাবী নং ১৮)।
এই আসারে সুফয়ান সাওরী আন দ্বারা বর্ণনা করেছেন।
যা উসূলে হাদীসের মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য নয় ( উমদাতুল ক্বারী ৩/১১২ আর রিসালাহ ১/৩৭৮ আসমাউল মুদাল্লিসীন ২৩ পৃষ্ঠা)।

প্রিয় পাঠক মন্ডলী!
টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় সংক্রান্ত সমস্ত আসার গুলো যঈফ প্রমাণিত হলো।
লক্ষনীয় বিষয়:- যারা টাকা দিয়ে ফিতরা প্রমাণ করতে খড়গহস্ত তাঁরা আদৌ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কোন দলীল উপস্থাপন করতে পারেননি বরং কিছু সাহাবীর মাওক্বুফ যঈফ আসার ও কিছু তাবিঈর মাক্বতু যঈফ দলীল পেশ করেছেন।
যা একেবারেই আমলযোগ্য নয়।
প্রকাশ থাকে যে, এই দলীল গুলো সহীহ হলেও আমলযোগ্য হতো না। কারণ এগুলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমলের পরিপন্থী।
মাওক্বুফ ও মারফু অর্থাৎ সাহাবী ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমলে মত পার্থক্য হলে অবশ্যই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমলই গ্রহণযোগ্য বা প্রণিধানযোগ্য। cld.

Thursday, May 14, 2020

সদাকাতুল ফিতর টাকা দিয়ে নাকি খাদ্যদ্রব্য দিয়ে দিতে হবে?

এবারের 'ফিতরা' কত? ৭০ টাকা থেকে ২,২০০ টাকা? নাকি অন্য কিছু !

প্রতিবারই রমাদন এলে মানুষের প্রশ্ন থাকে এবারের ফিতরা কত? যেন এটা প্রতিবছর নির্ধারন করার বিষয়! অথচ আল্লাহ্‌র রসুল (ﷺ) ১৪৫০ বছর আগেই এর পরিমান নির্ধারণ করে গেছেন।।

যারা সুন্নাহর অনুসরন করে ফিতরা আদায় করে থাকেন, তাঁরা কখনো উক্ত প্রশ্নটি তুলেন না যে এবারের ফিতরা কত টাকা! যারা ফিতরা আদায়ের প্রকৃত সুন্নাহ জানেন না এবং সুন্নাহর অনুসরন বাদ দিয়ে দ্রব্য মূল্য দিয়ে তথা টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় করেন তারাই মূলত প্রতিবছর এই সময় এলেই প্রশ্ন করেন এবারের ফিতরা কত টাকা দিতে হবে??

সদাকাতুল ফিতর সম্পর্কিত হাদীসসমূহ:
------------------------------------------------------
সদাকাতুল ফিতর বা আমরা যেটিকে ফিতরা বলি তা, মুসলিম নারী-পুরুষ, ছোট-বড়, সকলের জন্য আদায় করা ফরয/ওয়াজিব । নিন্মোক্ত হাদীসগুলোতে এ সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়:

(১) রসূল (ﷺ) ফিতরা হিসেবে খাদ্যদ্রব্য দিতে বলেছেন। এ ব্যাপারে বর্ণিত বিশুদ্ধ হাদীসগুলোতে স্রেফ খাদ্যদ্রব্যের কথা এসেছে, খাদ্যমূল্য বা অর্থের কথা আসেনি। যেমন: ইবনু ‘উমার (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে,

أنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ فَرَضَ زَكَاةَ الفِطرِ صَاعًا مِن تَمرٍ، أوْ صَاعًا مِن شَعِيرٍ، عَلَى كُلِّ حُرٍّ، أو عَبدٍ ذَكَرٍ أو أُنثَى مِنَ المُسلِمِينَ.

“প্রত্যেক স্বাধীন-ক্রীতদাস, নর-নারী, ছোটো-বড়ো সকল মুসলিমের ওপর আল্লাহ’র রসূল (ﷺ) ফিতরা হিসেবে খেজুর হোক অথবা যব হোক তা এক সা‘ পরিমাণ আদায় করা ফরজ করেছেন।” [সাহীহ বুখারী, হা/১৫০৩; সাহীহ মুসলিম, হা/৯৮৪]

আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন,

كُنَّا نُخرِجُ فِي عَهدِ رَسُولِ اللهِ ﷺ يَومَ الفِطرِ صَاعًا مِن طَعَامٍ. وَقَالَ أبُو سَعيدٍ: وَكَانَ طَعَامُنَا الشَّعِيرُ وَالزَّبِيبُ وَالأقِطُ وَالتَّمرُ.

“আমরা আল্লাহ’র রসূল (ﷺ) এর যুগে ঈদের দিন এক সা‘ পরিমাণ খাদ্য ফিতরা হিসেবে আদায় করতাম। আবূ সা‘ঈদ (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) বলেন, ‘আমাদের খাদ্যদ্রব্য ছিল যব, কিসমিস, পনির ও খেজুর’।” [সাহীহ বুখারী, হা/১৫১০]

রসূল (ﷺ) এর যুগে অর্থ থাকা সত্ত্বেও কোনো বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত হয়নি যে, তিনি ও তাঁর সাহাবীগণ খাদ্যমূল্য দিয়ে ফিতরা আদায় করেছেন।।

(২) রসূল (ﷺ) ফিতরকে মিসকীনদের খাদ্যস্বরূপ ফরজ করেছেন, অর্থস্বরূপ ফরজ করেননি। ইবনু ‘আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন,

فَرَضَ رَسُولُ اللهِ ﷺ زَكَاةَ الفِطرِ طُهرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغوِ وَالرَّفَثِ، وَطُعمَةً لِلمَسَاكِينِ.

“আল্লাহ’র রাসূল (ﷺ) সিয়াম অবস্থায় কৃত অনর্থক কথাবার্তা ও অশালীন আচরণ থেকে ছায়িমকে (রোজাদারকে) পরিশুদ্ধকারীস্বরূপ এবং মিসকীনদের খাদ্যস্বরূপ ফিতরকে ফরজ করেছেন।” [আবূ দাঊদ, হা/১৬০৯; ইবনু মাজাহ, হা/১৮২৭; সনদ: হাসান]

(৩) ইমাম ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, “ইবাদতের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো তা দলিলনির্ভর হতে হবে। সুতরাং কারও জন্য সেই ইবাদত করা জায়েজ নয়, যেই ইবাদত প্রজ্ঞাবান শরিয়তপ্রণেতা রসূল (ﷺ) থেকে সাব্যস্ত হয়নি।” [ইমাম ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ), মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১৪; পৃষ্ঠা: ২০৮; দারুল ক্বাসিম, রিয়াদ কর্তৃক প্রকাশিত; সন: ১৪২০ হিজরী (১ম প্রকাশ)]

(৪) রসূল (ﷺ) এর যুগে মুদ্রার প্রচলন ছিল এবং অভাবী ব্যক্তির বিদ্যমানতাও ছিল। তখন স্বাভাবিকভাবেই অভাবী ব্যক্তিরা অর্থের মুখাপেক্ষী ছিল। এতৎসত্ত্বেও রসূল (ﷺ) এর যুগে অর্থ দিয়ে ফিতরা আদায় করা হয়নি। আর এটি শরিয়তের একটি সুবিদিত মূলনীতি যে, প্রয়োজনের সময় আলোচনাকে বিলম্ব করা না-জায়েজ (لا يجوز تأخير البيان عن وقت الحاجة)। অর্থাৎ, প্রয়োজনের সময় হুকুম বর্ণনা করতে দেরি করা জায়েজ নয়। সুতরাং রসূল (ﷺ) যেহেতু অর্থ দিয়ে ফিতরা আদায় করার বৈধতা বর্ণনা করেননি, সেহেতু অর্থ দিয়ে তা আদায় করা শরিয়তসম্মত হবে না।।

সদাকাতুল ফিতর সম্পর্কে আলিমদের মতামত:
----------------------------------------------------------------
এখন আমরা দেখবো খাদ্য দিয়ে ফিতরা দেয়া সম্পর্কে ওলামায়ে কেরামের মতামত কি:

(১) শাইখুল ইসলাম হুজ্জাতুল উম্মাহ ইমামু দারিল হিজরাহ আবূ ‘আব্দুল্লাহ মালিক বিন আনাস আল-আসবাহী আল-মাদানী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৭৯ হি.] বলেছেন,

ولا يجزئ أن يجعل الرجل مكان زكاة الفطر عرضًا من العروض وليس كذلك أمر النبي عليه الصلاة والسلام.

“ফিতরার জায়গায় অর্থ বা খাদ্যমূল্য নির্ধারণ করলে তা যথেষ্ট হবে না। নাবী (ﷺ) এভাবে আদেশ দেননি।”
[আল-মুদাওয়্যানাতুল কুবরা, খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৩৮৫; গৃহীত: tasfiatarbia.org]

(২) শাইখুল ইসলাম নাসিরুল হাদীস ফাক্বীহুল মিল্লাত ইমাম মুহাম্মাদ বিন ইদরীস আশ-শাফি‘ঈ আল-মাক্কী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ২০৪ হি.] বলেছেন,

ولا يؤدي قيمته (يعني طعام الفطرة).

“আর ফিতরার খাদ্যমূল্য দিয়ে তা আদায় করবে না।” [ইমাম শাফি‘ঈ (রাহিমাহুল্লাহ) কিতাবুল উম্ম, খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৭৪; দারুল ওয়াফা কর্তৃক প্রকাশিত; সন: ১৪২২ হি./২০০১ খ্রি. (১ম প্রকাশ)]

(৩) শাইখুল ইসলাম ইমামু আহলিস সুন্নাহ আবূ ‘আব্দুল্লাহ আহমাদ বিন মুহাম্মাদ বিন হাম্বাল আশ-শাইবানী আল-বাগদাদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ২৪১ হি.] বলেছেন,

ولا يعطي قيمته، قيل له: يقولون: عمر بن عبد العزيز كان يأخذ القيمة، قال: يدعون قول رسول الله ﷺ ويقولون قال فلان؟ قال ابن عمر: فرض رسول الله ﷺ. وقال الله: أطيعوا الله وأطيعوا الرسول. وقال قوم يردون السنن: قال وقال فلان.

“ফিতরার খাদ্যমূল্য প্রদান করবে না।” তখন তাঁকে বলা হলো, “তারা বলে, ‘উমার বিন ‘আব্দুল ‘আযীয খাদ্যমূল্য গ্রহণ করতেন।” তখন তিনি (ইমাম আহমাদ) বললেন, “তারা আল্লাহ’র রাসূলের (ﷺ) কথা পরিত্যাগ করেছে, আর বলেছে, অমুক এটা বলেছেন?! ইবনু ‘উমার (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) বলেছেন, “রাসূলুল্লাহ (ﷺ) (ফিতরা) ফরজ করেছেন।” আর আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা আল্লাহ’র আনুগত্য করো এবং রাসূলের আনুগত্য করো।” (সূরাহ নিসা: ৫৯) অথচ একদল লোক সুন্নাহকে প্রত্যাখ্যান করে বলছে, অমুক বলেছেন, আর তমুক বলেছেন!” [ইমাম ইবনু কুদামাহ (রাহিমাহুল্লাহ), আল-মুগনী; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ২৯৫; দারু ‘আলামিল কুতুব, রিয়াদ কর্তৃক প্রকাশিত; সন: ১৪১৮ হি./১৯৯৮ খ্রি. (৩য় প্রকাশ)]

(৪) সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতী যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ ও মুহাদ্দিস শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] এ ব্যাপারে দীর্ঘ আলোচনা করার পর বলেছেন,

ومما ذكرنا يَتَّضِحُ لصاحب الحق أن إخراج النقود في زكاة الفطر لا يجوز ولا يجزئ عمن أخرجه؛ لكونه مخالفا لما ذُكر من الأدلة الشرعية.

“আমরা যে আলোচনা করলাম তা সত্যানুসন্ধানী ব্যক্তির কাছে স্পষ্ট করে দেয় যে, অর্থ দিয়ে ফিতরা আদায় করা জায়েজ নয়, আর যে ব্যক্তি অর্থ দিয়ে আদায় করে, তার পক্ষ থেকে তা যথেষ্ট হবে না। যেহেতু তা উল্লিখিত শার‘ঈ দলিল বিরোধী।” [ইমাম ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ), মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১৪; পৃষ্ঠা: ২১১; দারুল ক্বাসিম, রিয়াদ কর্তৃক প্রকাশিত; সন: ১৪২০ হিজরী (১ম প্রকাশ)]

(৫) বিগত শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ আল-মুজাদ্দিদ আল-ফাক্বীহুন নাক্বিদ ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন,

الذين يقولون بجواز إخراج صدقة الفطر نقودًا هم مخطئون، لأنهم يخالفون النص.

“যারা বলেন, অর্থ দ্বারা ফিতরা আদায় করা জায়েজ, তারা ভুলে পতিত হয়েছেন। কেননা তারা সুস্পষ্ট দলিলের বিরোধিতা করছেন।” [ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ), সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর; ২৭৪ নং অডিয়ো ক্লিপ; সংগৃহীত: sahab.net]

(৬.) বিগত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন,

لا يجوز أن تُدفَعَ زكاة الفطر نقودا بأي حال من الأحوال، بل تدفع طعاما، والفقير إذا شاء باع هذا الطعام وانتفع بثمنه.

“অর্থ দিয়ে ফিতরা দেওয়া কোনো অবস্থাতেই জায়েজ নয়। বরং তা খাদ্যদ্রব্য দ্বারা আদায় করতে হবে। তবে অভাবী ব্যক্তি চাইলে সে খাদ্য বিক্রি করে তার মূল্য দিয়ে উপকৃত হতে পারবে।” [ইমাম ইবনু ‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ), মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল; খণ্ড:১৮; পৃষ্ঠা: ২৭৭; দারুস সুরাইয়্যা, রিয়াদ কর্তৃক প্রকাশিত; সন: ১৪২৩ হি./২০০৩ খ্রি. (১ম প্রকাশ)]

(৭) সৌদি ফাতাওয়া বোর্ড এবং সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের প্রবীণ সদস্য যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ইমাম সালিহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫৪ হি./১৯৩৫ খ্রি.] বলেছেন,

إخراج القيمة نقودًا عن صدقة الفطر؛ هذا لا يجزئ؛ لأنه خلاف ما أمر به النبي ﷺ، لأن الرسول ﷺ أمر بإخراجه من الطعام. ... هذا قول جمهور أهل العلم، والأئمة الثلاثة: مالكٍ والشافعيِّ وأحمدَ رحمهم الله، وأجاز أبو حنيفة –رحمه الله– إخراج القيمة، ولكن هذا خلاف النص واجتهاد مع النص، ولا يجوز الإجتهاد مع وجود النص، ولهذا لما سئل الإمام أحمد رحمه الله عن إخراج القيمة وأن فلانًا أفتى بإخراج القيمة قال رحمه الله: يدعون قول رسول الله ﷺ ويأخذون بقول فلان. فالواجب العمل بالنص.

“অর্থ দিয়ে ফিতরা আদায় করলে তা (আদায় হিসেবে) যথেষ্ট হবে না। কেননা তা নাবী (ﷺ) এর নির্দেশ বিরোধী। যেহেতু রাসূল (ﷺ) খাদ্য দ্বারা ফিতরা আদায় করতে আদেশ করেছেন। এটা অধিকাংশ ‘আলিমের মত। এটা তিন ইমাম তথা মালিক, শাফি‘ঈ ও আহমাদ (রাহিমাহুমুল্লাহ)’র মত। আবূ হানীফাহ (রাহিমাহুল্লাহ) অর্থ দিয়ে আদায় করা জায়েজ বলেছেন। কিন্তু এটা সুস্পষ্ট দলিলের বিরোধী এবং সুস্পষ্ট দলিলের সাথে ইজতিহাদ। আর সুস্পষ্ট দলিলের বিদ্যমানতায় ইজতিহাদ জায়েজ নয়। একারণে যখন ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) কে অর্থ দিয়ে ফিতরা আদায়ের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হয় এবং বলা হয় যে, অমুক (‘আলিম) ‘অর্থ দিয়ে ফিতরা আদায় বৈধ’ ফাতওয়া দিয়েছেন, তখন তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)'র এর কথা পরিত্যাগ করছে, আর অমুকের কথা গ্রহণ করছে!’ সুতরাং সুস্পষ্ট দলিল অনুযায়ী আমল করা ওয়াজিব।” [ইমাম সালিহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ), শারহু যাদিল মুস্তাক্বনি‘; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৩০৩-৩০৫; দারুল ‘আসিমাহ, রিয়াদ কর্তৃক প্রকাশিত; সন: ১৪২৪ হি./২০০৪ খ্রি. (১ম প্রকাশ)]

(৮) ইমাম সালিহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) কে জিজ্ঞেস করা হয়েছে,

في بلادنا زكاة الفطر تدفع مالًا بحجة أن المساكين لا يريدون حبوبًا وغيرها، فماذا نفعل؟

“আমাদের দেশে অর্থ দ্বারা ফিতরা আদায় করা হয় এ দলিলের ভিত্তিতে যে, মিসকীনরা শস্য চায় না। এক্ষেত্রে আমরা কী করব?”

শাইখ (হাফিযাহুল্লাহ) উত্তরে বলেছেন,

ليس الأمر للمساكين، هذه عبادة، تنفذ كما جائت عن الرسول ﷺ، والذي لا يريد الطعام هذا ليس بمحتاج، أعطه المحتاج الذي يريد الطعام.

“এটা মিসকীনদের কথা অনুযায়ী হবে না। এটি একটি ইবাদত। রাসূল (ﷺ) থেকে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, সেভাবেই তা সম্পাদন করতে হবে। আর যে খাদ্য চায় না, সে মূলত অভাবীই নয়। সুতরাং ফিতরা অভাবী ব্যক্তিকে দাও, যে খাদ্য চায়।”
[দ্র.: www.alfawzan.af.org.sa/ar/node/12939.]

(৯) সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটি (সৌদি ফাতাওয়া বোর্ড) প্রদত্ত ফাতওয়া’য় বলা হয়েছে,

ﻭﻻ ﻳﺠﻮﺯ ﺗﻮﺯﻳﻊ ﺯﻛﺎﺓ ﺍﻟﻔﻄﺮ ﻧﻘﺪًﺍ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﺼﺤﻴﺢ ﻓﻴﻤﺎ ﻧﻌﻠﻢ، ﻭﻫﻮ ﻗﻮﻝ ﺟﻤﻬﻮﺭ ﺍﻟﻌﻠﻤﺎﺀ.

“আমাদের জানামতে বিশুদ্ধ মতানুযায়ী অর্থ দ্বারা ফিতরা বণ্টন করা জায়েজ নয়। এটাই অধিকাংশ ‘আলিমের মত।”
ফাত‌ওয়া প্রদান করেছেন—
চেয়ারম্যান: শাইখ ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ),
ডেপুটি চেয়ারম্যান: শাইখ ‘আব্দুর রাযযাক্ব ‘আফীফী (রাহিমাহুল্লাহ),
মেম্বার: শাইখ ‘আব্দুল্লাহ বিন গুদাইয়্যান (রাহিমাহুল্লাহ),
মেম্বার: শাইখ ‘আব্দুল্লাহ বিন ক্বা‘ঊদ (রাহিমাহুল্লাহ)। [ফাতাওয়া লাজনাহ দাইমাহ; ফাতওয়া নং: ৯২৩১; প্রশ্ন নং: ৪; সংগৃহীত: alifta.net]

(১০) স্থায়ী কমিটির আরেকটি ফাতওয়া’য় বলা হয়েছে,

ﻻ ﻳﺠﻮﺯ ﺩﻓﻊ ﺍﻟﻨﻘﻮﺩ ﺑﺪﻻً ﻣﻦ ﺍﻟﻄﻌﺎﻡ ﻓﻲ ﺻﺪﻗﺔ ﺍﻟﻔﻄﺮ ؛ ﻷﻥ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﺃﻣﺮ ﺑﺈﺧﺮﺍﺝ ﺍﻟﻄﻌﺎﻡ ﻓﻲ ﺻﺪﻗﺔ ﺍﻟﻔﻄﺮ.

“খাদ্যের পরিবর্তে অর্থ দিয়ে ফিতরা আদায় করা জায়েজ নয়। কেননা নাবী (ﷺ) খাদ্য দিয়ে ফিতরা আদায় করতে আদেশ করেছেন।” [ফাতাওয়া লাজনাহ দাইমাহ; আল ইফতা ডট নেটে রমজান মাস সেকশনের ‘যাকাত ও ফিতরা’ অংশের ফাত‌ওয়া; প্রশ্ন নং: ৫; সংগৃহীত: alifta.net]

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, রাসুল (ﷺ) এর জীবদ্দশায় দ্বীন ইসলাম পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। এর প্রমান সুরা মা’য়িদা এর ৩য় আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন বলেন,

‘‘আজ আমি তোমাদের জন্য দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামাত সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসাবে পছন্দ করলাম।”

আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ এবং এর মধ্যে পালনীয় যাবতীয় বিধি বিধানও পূর্ণাঙ্গ। কোন ইবাদাত তা ফরজ, সুন্নাত বা নফল হোক না কেন, তার ধরনে পরিবর্তন আনার কোন সুযোগ নেই।।

উক্ত হাদীস সমূহ ও কোরআনের আয়াত এবং ওলামায়ে কেরামের ভাষ্যমতে বোঝা যাচ্ছে, ফিতরা আদায় করতে হবে খাদ্যদ্রব্য দ্বারা। খাদ্যের মূল্য বা টাকা পয়সা অর্থাৎ নগদ অর্থ ফিতরা গ্রহণকারীর হাতে সরাসরি উঠিয়ে দিয়ে নয়! আর তা আদায় করতে হবে প্রত্যেকের জন্য মাথাপিছু এক সা’ খাদ্যশস্য দিয়ে। সা' হচ্ছে তৎকালীন সময়ের এক ধরনের ওজন করার পাত্র।

উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে পরিশেষে বলা যায়, প্রত্যেক দেশের প্রধান খাদ্য দিয়ে ফিতরা আদায় করতে হবে। মানে যে দেশের মানুষের যেটা প্রধান খাদ্যদ্রব্য সেটা দিয়েই ফিতরা আদায় করা উচিত। আমাদের এই কৃষি প্রধান দেশে প্রধান খাদ্য (طعام) চাল। সে কারনে চাল দিয়ে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করাই উত্তম। তবে চাইতে অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য দিয়েও ফিতর দেওয়া যাবে। খাদ্যশস্যের মূল্য দিয়ে সাদাকাতুল ফিতর প্রদানের স্বপক্ষে কুরআন-হাদীসে স্পষ্ট কোন দলীল নেই। সুতরাং মুদ্রা দিয়ে ফিতরা আদায় করা সুন্নাহর বিরোধী কাজ।।


সাদাকাতুল ফিতরের পরিমাণ:
--------------------------------------
সা’ হচ্ছে মূলত একটি পাত্রের পরিমাপ !!! এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে নিম্ন লিংকের ব্লগটি পড়ুনঃ
https://kmarifin.blogspot.com/2019/05/blog-post_81.html?m=1

আসুন আমরা রসুল ছঃ এর আদর্শ অনুসরণ করি।।

Monday, May 11, 2020

সাহরির সময় ফজর হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ হলে করনীয় কি?

⏩ #সাহরির_সময়ে_ফজর_উদয়_হওয়ার_ব্যাপারে_সন্দেহ_হলেঃ

ফজর উদয় হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ হলে রোযাদার ততক্ষণ পর্যন্ত পানাহার করতে পারে, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে ফজর উদয় হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছে। আর সন্দেহের উপর পানাহার বন্ধ করবে না। যেহেতু মহান আল্লহ পানাহার বন্ধ করার শেষ সময় নির্ধারিত করেছেন নিশ্চিত ও স্পষ্ট ফজরকে; সন্দিগ্ধ ও অস্পষ্ট ফজরকে নয়। তিনি বলেছেন,
{وَكُلُوْا وَاشْرَبُوْا حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ}
অর্থাৎ, আর তোমরা পানাহার কর, যতক্ষণ পর্যন্ত না (রাতের) কালো অন্ধকার থেকে ফজরের সাদা রেখা তোমাদের নিকট স্পষ্ট হয়েছে।
 ✔ 📖 (সূরা আল বাক্বারাহ: ২/১৮৭)।
এক ব্যক্তি ইবনে আববাস (রাঃ)-কে বলল, ‘আমি সেহরী খেতে থাকি। অতঃপর যখন (ফজর হওয়ার) সন্দেহ হয়, তখন (পানাহার) বন্ধ করি।’ তিনি বললেন, ‘যতক্ষণ সন্দেহ থাকে ততক্ষণ খেতে থাক, সন্দেহ দূর হয়ে গেলে খাওয়া বন্ধ কর।’
 ✔ 📚 (ইবনে আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ ৯০৫৭, ৯০৬৭নং)।
ইমাম আহমাদ (রঃ) বলেন, ‘ফজর উদয় হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ হলেও যতক্ষণ পর্যন্ত না নিশ্চিত হওয়া গেছে ততক্ষণ রোযাদার পানাহার করতে পারবে।’
 ✔ 📚 (ফিকহুস সুন্নাহ ১/৪০৪)।
যদি কোন ব্যক্তি ফজর উদয় হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ রেখে খায়, অথবা ফজর উদয় হয়নি মনে করে খায়, অতঃপর জানতে পারে যে, খাওয়ার আগেই ফজর উদয় হয়ে গেছে, অথবা ফজরের আযান হয়ে গেছে, তাহলে তার সিয়াম শুদ্ধ এবং তাকে ঐ সিয়াম কাযা করতে হবে না। যদিও সে আসলে ফজরের পর খেয়েছে। কারণ, সে না জেনে খেয়েছে। আর না জেনে খাওয়া ক্ষমার্হ। অর্থাৎ তা ধর্তব্য নয়।
 ✔ 📚 (আশ্শারহুল মুমতে’ ৬/৪০৯-৪১১)।
পক্ষান্তরে যদি কেউ ঘুম থেকে জেগে উঠে জানতে পারে যে, ফজর বা ফজরের আযান হয়ে গেছে এবং তা সত্ত্বে পানি বা অন্য কিছু খায়, তাহলে তার সিয়াম হবে না। তাকে ঐ দিন পানাহার ইত্যাদি সায়িমের মতই বন্ধ রেখে রমাদানের পর কাযা রাখতে হবে।
জ্ঞাতব্য যে, সাহারীর শেষ সময় হল পূর্ব আকাশে ছড়িয়ে পড়া সাদা আলোক রেখার উদ্ভব কাল। সামুরাহ বিন জুনদুব (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লহর রসূল সঃ বলেন, ‘‘বিলালের আযান এবং (পূর্বাকাশে) আলম্বিত শুভ্র জ্যোতি যেন তোমাদেরকে সেহরী খাওয়াতে বাধা না দেয়। অবশ্য পূর্বাকাশে ছড়িয়ে পড়া জ্যোতি দেখে খাওয়া বন্ধ করো।’’
 ✔ 📚 (আহমাদ, মুসলিম, আবূ দাঊদ ২৩৪৬, তিরমিযী, ইবনে আবী শাইবাহঃ, দারাকুত্বনী, বাইহাকী, ইরওয়াউল গালীল ৯১৫নং)।
বলা বাহুল্য, ছড়িয়ে পড়া উক্ত সাদা রেখা পরিদৃষ্ট হলে সাথে সাথে রোযাদারের জন্য পানাহার ইত্যাদি থেকে বিরত হওয়া ওয়াজেব। তাতে সে ফজরের আযান শুনুক, অথবা না শুনুক। কারণ, মহান আল্লাহ বলেন, ‘‘তোমরা পানাহার কর, যতক্ষণ পর্যন্ত না (রাতের) কালো অন্ধকার থেকে ফজরের সাদা রেখা তোমাদের নিকট স্পষ্ট হয়েছে।’’
 ✔ 📖 (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২/১৮৭)।
রসুলুল্লহ সঃ বলেন, ‘‘ইবনে উম্মে মাকতূমের আযান না দেওয়া পর্যন্ত তোমরা পানাহার কর। কারণ, সে ফজর উদয় না হলে আযান দেয় না।’’
 ✔ 📚 (বুখারী ১৯১৮, মুসলিম ১০৯২নং)।
লক্ষণীয় যে, ফজর উদয় হয়েছে কি না, তা-ই দেখার বিষয়; আযান হয়েছে কি না, তা নয়। অতএব মুআযযিন যদি নির্ভরযোগ্য হয় এবং জানা যায় যে, সে ফজর উদয় না হলে আযান দেয় না অথবা ফজর উদয় হওয়ার পরে দেরী করে আযান দেয় না, তাহলে তার আযান শোনামাত্র পানাহার থেকে বিরত হওয়া ওয়াজেব। পক্ষান্তরে মুআযযিন যদি (ফজর উদয়ের) সময় হওয়ার পূর্বেই আযান দেয়, তাহলে তার আযান শুনে পানাহার বন্ধ করা ওয়াজেব নয়। তদনরূপ মুআযযিন যদি ঢিলে হয় এবং যথাসময় থেকে দেরী করে আযান দেয়, তাহলে সময় শেষ জানা সত্ত্বেও আযান হয়নি বলে খেয়ে যাওয়া বৈধ নয়। কারণ, এতে সিয়াম হবে না।
কিন্তু মুআযযিনের অবস্থা না জানা গেলে, অথবা একই শহরে একাধিক মসজিদের একাধিক মুআযযেনের বিভিন্ন সময়ে আযান হলে এবং শহরের ভিতরে ঘর-বাড়ি তথা লাইটের ফলে ফজর উদয় হওয়ার সময় নিজে নির্ধারণ না করতে পারলে নির্ভরযোগ্য সেই ইসলামী পঞ্জিকা অনুযায়ী আমল করা জরুরী, যাতে নিখুঁতভাবে ফজর উদয়ের স্থানীয় সময় ঘ¦টা-মিনিট সহ স্পষ্ট লিখা থাকে। অতঃপর নিজের ঘড়ি ঠিক রেখে সেই সময় অনুযায়ী সাহারী-ইফতার করলে রসুলুল্লহ সঃ -এর সেই হাদীসের উপর আমল হবে, যাতে তিনি বলেন, ‘‘যে বিষয়ে সন্দেহ আছে সে বিষয় বর্জন করে তাই কর যাতে সন্দেহ নেই।’’
 ✔ 📚 (আহমাদ, মুসনাদ, তিরমিযী ২৫১৮, নাসাঈ, ইবনে হিববান, সহীহ, ত্বাবারানী, মু’জাম প্রমুখ, ইরওয়াউল গালীল, আলবানী ২০৭৪, সহীহুল জামেইস সাগীর, আলবানী ৩৩৭৭, ৩৩৭৮নং)।
‘‘সুতরাং যে সন্দিহান বিষয়াবলী থেকে দূরে থাকবে, সে তার দ্বীন ও ইজ্জতকে বাঁচিয়ে নেবে।’’
 ✔ 📚 (আহমাদ, মুসনাদ ৪/২৬৯, ২৭০, বুখারী ৫২, মুসলিম ১৫৯৯নং, আবূ দাঊদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, দাঃ)।
জ্ঞাতব্য যে, ফজর উদয় হওয়ার ৫/১০ মিনিট আগে সতর্কতামূলকভাবে পানাহার থেকে বিরত হওয়া একটি বিদআত। কোন কোন পঞ্জিকা (বা রমাযান-সওগাতে) যে একটি ঘর সেহরীর শেষ সময়ের এবং পৃথক আর একটি ঘর ফজরের আযানের লক্ষ্য করা যায়, তা আসলে শরীয়ত-বিরোধী কাজ।
 ✔ 📚 (দ্রঃ তামামুল মিন্নাহ, আল্লামা আলবানী ৪১৮পৃঃ, সামানিয়া ওয়া আরবাঊন সুআলান ফিস্-সিয়াম ৪৮পৃঃ)।
কারণ, সাহারীর শেষ সময় যেটাই, সেটাই ফজরের আযানের সময়। আর ফজরের আযানের সময়ের আগে লোকেদের পানাহার বন্ধ করা অবশ্যই শরীয়ত-বিরোধী কাজ।
বলা বাহুল্য, (বিশেষ করে) রমাদান মাসে মুআযযিন-ইমামদের উচিৎ, যথাসময়ে আযান দেওয়ার ব্যাপারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা রাখা। রাইট-টাইমের ঘড়ি দ্বারা ফজর উদয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আযান দেওয়া মোটেই উচিৎ নয়। যাতে তাঁরা লোকেদেরকে ধোকা দিয়ে এমন সময় আযান না দিয়ে বসেন, যে সময়ে তাদের জন্য আল্লহর হালালকৃত খাদ্য তাদের জন্য হারাম করে দেন এবং সময় হওয়ার পূর্বেই ফজরের সলাত হালাল করে বসেন। আর এ যে কত বড় বিপজ্জনক, তা অনুমেয়।
 ✔ 📚 (ইবনে উষাইমীন ফাসিঃ মুসনিদ ৩৬পৃঃ)।
আবূ হুরাইরা কর্তৃক বর্ণিত, রসুলুল্লহ সঃ বলেন, ‘‘যখন তোমাদের কেউ আযান শোনে এবং সেই সময় তার হাতে (পানির) পাত্র থাকে, তখন সে যেন তা থেকে নিজের প্রয়োজন পূর্ণ না করা পর্যন্ত রেখে না দেয়।’’
 ✔ 📚 (আহমাদ, মুসনাদ ২/৪৩২, ৫১০, আবূ দাঊদ ২৩৫০, দারাকুত্বনী, সুনান ২১৬২, হাকেম, মুস্তাদ্রাক ১/২০৩, বাইহাকী, সিলসিলাহ সহীহাহ, আলবানী ১৩৯৪নং)।
অনেক উলামা উক্ত হাদীসটিকে এ কথার দলীল মনে করেন যে, যে ব্যক্তির হাতে খাবারের পাত্র (নিয়ে খেতে) থাকা অবস্থায় ফজর (বা তার আযান) হয়ে যায়, তার জন্য তা থেকে নিজের প্রয়োজন পূর্ণ না করা পর্যন্ত রেখে দেওয়া (খাওয়া বন্ধ করা) বৈধ নয়। সুতরাং এ ব্যাপারটি আয়াতের সাধারণ নির্দেশ থেকে স্বতন্ত্র। মহান আল্লাহ বলেন,
{وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الْأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الْأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ}
‘‘আর তোমরা পানাহার কর, যতক্ষণ পর্যন্ত না (রাতের) কালো অন্ধকার থেকে ফজরের সাদা রেখা তোমাদের নিকট স্পষ্ট হয়েছে।’’
 ✔ 📖 (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২/১৮৭)।
অতএব উক্ত আয়াত তথা অনুরূপ অর্থের সকল হাদীস উপর্যুক্ত হাদীসের বিরোধী নয়। তাছাড়া ইজমার প্রতিকূলও নয়। বরং সাহাবাদের একটি জামাআত এবং আরো অন্যান্যগণ উক্ত হাদীস অপেক্ষা আরো প্রশস্ততা রেখে মনে করেন যে, ফজর উজ্জ্বল হয়ে গেলে এবং ভোরের শুভ্র আলো রাস্তায় ছড়িয়ে পড়লেও সে পর্যন্ত পানাহার করা বৈধ।
 ✔ 📚 (দ্রঃ ফাতহুল বারী ৪/১৬২-১৬৩, সিলসিলাহ সহীহাহ, আলবানী ৩/৩৮২-৩৮৪, তামামুল মিন্নাহ, আল্লামা আলবানী ৪১৭-৪১৮পৃঃ)।
অনেকে মনে করেন, উক্ত হাদীসে ‘আযান’ বলতে বিলালের আযানকে বুঝানো হয়েছে; যা প্রথম (সাহারী বা তাহাজ্জুদের) আযান এবং যা ফজরের আগে দেওয়া হত। রসুলুল্লহ সঃ বলেন, ‘‘বিলাল রাতে আযান দেয়। সুতরাং তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত পানাহার করতে থাক, যতক্ষণ পর্যন্ত না ইবনে উম্মে মাকতূম আযান দেয়।’’
 ✔ 📚 (বুখারী ৬১৭নং, মুসলিম)।
অথবা উক্ত হাদীসের অর্থ এই যে, আযান শুনেও যদি ফজর উদয়ে সন্দেহ হয়, যেমন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকার ফলে অন্ধকার থাকে, তাহলে সে সময় কেবল আযানে ফজর হওয়ার কথা নিশ্চিতরূপে জানা যায় না। কারণ, ফজর জানার যে মাধ্যম তা (ফজরের জ্যোতি) নেই। আর মুআযযিন তা দেখে ফজর উদয়ের কথা জানতে পারলে সেও জানতে পারত। পক্ষান্তরে ফজর উদয় হওয়ার কথা এমনিই বুঝতে পারা গেলে মুআযযেনের আযান শোনার প্রয়োজন নেই। কারণ, সে তো (রাতের) কালো অন্ধকার থেকে ফজরের সাদা রেখা স্পষ্ট হলেই পানাহার থেকে বিরত থাকতে আদিষ্ট। এ কথা বলেছেন খাত্ত্বাবী।
বাইহাক্বী বলেন, ‘উক্ত হাদীস সহীহ হলে অধিকাংশ উলামার নিকট তার ব্যাখ্যা এই যে, রসুলুল্লহ সঃ জেনেছিলেন, মুআযযিন ফজর হওয়ার আগে আযান দেয়। সুতরাং তখন সে পান করলে ফজর উদয়ের আগেই পান করা হবে।’
 ✔ 📚 (বাইহাকী ৪/২১৮)।
আলী আল-ক্বারী বলেন, ‘উক্ত নির্দেশ তখন প্রযোজ্য, যখন ফজর উদয়ে সন্দেহ হয়।’ ইবনুল মালেক বলেন, ‘উক্ত নির্দেশ তখন প্রযোজ্য, যখন জানতে পারবে না যে, ফজর উদয় হয়ে গেছে। নচেৎ, যখন ফজর উদয় হওয়ার কথা জানতে পারবে এবং তাতে সন্দেহ করবে তখন নয়।’
 ✔ 📚 (আউনুল মাবুদ ৬/৩৪১-৩৪২)।
এ ছাড়া আরো অন্য ব্যাখ্যাও করা হয়েছে। সুতরাং আল্লাহই ভালো জানেন।
বলা বাহুল্য, শেষোক্ত উলামাদের মতানুসারে যখন কোন সায়িম (রোযাদার) মুখে কোন খাদ্য বা পানীয় থাকা অবস্থায় ফজরের আযান শুনবে, তখনই সে তা মুখ থেকে উগলে ফেলে দেবে। আর এতে তার সিয়াম শুদ্ধ হয়ে যাবে।
 ✔ 📚 (সাবঊনা মাসআলাহ ফিস্-সিয়াম ৬১নং)।
প্রকাশ থাকে যে, সাহারী খাওয়ার পর মুআযযিনের আযানের অপেক্ষা করে তার ‘আল্লহু......’ বলার সাথে সাথে তৈরী রাখা পানি শেষ বারের মত পান করা বৈধ নয়। কারণ, আযান হয় ফজর উদয় হওয়ার সাথে সাথে এবং এ কথা জানাবার উদ্দেশ্যে যে সাহারীর সময় শেষ। অতএব খাবার সময় নেই জানার পরেও খাওয়া শরীয়তের বিরোধিতা তথা সিয়াম নষ্ট করার কাজ।
 ✔ 📚 (তাওজীহাতুন অফাওয়াএদ লিসসা-য়েমীনা অসসায়েমাত ৪০পৃঃ দ্রঃ)।
পূর্বের আলোচনায় আমরা জানতে পেরেছি যে, ফজরের আগে একটি আযান আছে, যা তাহাজ্জুদ ও সেহরীর সময় জানাবার জন্য ব্যবহার করা হত রসুলুল্লহ সঃ -এর যুগে। অতএব সাহারীর সময় লোকেদেরকে জাগানোর জন্য সেই আযানের বদলে কুরআন বা গজল পড়া, বেল বা ঘন্টা বাজানো, অথবা তোপ দাগা বিদআত।
 ✔ 📚 (মু’জামুল বিদা’ ২৬৮পৃঃ)।

 📔 রমাযানের ফাযায়েল ও রোযার মাসায়েল।
 📝 লেখকঃ আবদুল হামীদ ফাইযী।

Tuesday, May 5, 2020

"ইফতারের পূর্বে কি দুআ কবুল হয় বা ফেরত দেওয়া হয় না" এ মর্মে বর্ণিত হাদিসটি কি সহীহ?


প্রশ্ন: “ইফতারের পূর্বে কি দুআ কবুল হয়” এ মর্মে বর্ণিত হাদিসটি কি সহীহ?

উত্তর:
ছিয়াম অবস্থায় দুআ ফিরিয়ে দেয়া হয় না এ ব্যাপারে সহীহ হাদিস রয়েছে। নাবী ছঃ বলেন,

ثَلاَثُ دَعَوَاتٍ لاَ تُرَدُّ دَعْوَةُ الْوَالِدِ، وَدَعْوَةُ الصَّائِمِ، وَدَعْوَةُ الْمُسَافِرِ

‘‘তিন ব্যক্তির দুআ অগ্রাহ্য করা বা ফিরিয়ে দেয়া হয় না; পিতার দুআ, ছায়িমের (রোজাদারের) দুআ এবং মুসাফিরের দুআ।’’ (বাইহাকী ৩/৩৪৫, প্রমুখ, সিলসিলাহ সহীহাহ, আলবানী ১৭৯৭নং)

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত। রসুল ছঃ বলেছেন:

إنَّ للصائمِ عندَ فِطرِه لَدعوةً ما تُرَدُّ قال سمِعتُ عبدَ اللهِ يقولُ عندَ فِطرِه : اللهم إني أسألُكَ برحمتِكَ التي وسِعَتْ كلَّ شيءٍ أن تغفِرَ لي – زاد في روايةٍ : ذُنوبي

“ছায়িমের ইফতারের সময়ের দুআ ফিরিয়ে দেয়া হয় না।” তিনি বলেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রা. কে ইফতার করার সময় বলতে শুনেছি:

اللهم إني أسألُكَ برحمتِكَ التي وسِعَتْ كلَّ شيءٍ أن تغفِرَ لي

”হে আল্লাহ, তোমার সর্বব্যাপী দয়ার ওসিলায় প্রার্থনা করছি, তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও।” অন্য বর্ণনায়: “আমার গুনাহগুলো ক্ষমা করে দাও।”

💠 ইমাম বুসীরী তার ইতহাফুল মাহারা গ্রন্থে (৩/১০২) উক্ত হাদিসটির ব্যাপারে বলেন, হাদিসটি সহীহ। আর এর সমর্থনে আরও হাদিস রয়েছে।

💠 ইবনে হাজার রহঃ “রোজাদারের ইফতারের সময়ের দুআ ফিরিয়ে দেয়া হয় না।” হাদিসটিকে ‘হাসান’ বলে সাব্যস্ত করেছেন। [ আল ফাতুহাত আর রাব্বানিয়াহ ৪/৩৪২)]

💠 আহমদ শাকিরও উক্ত হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন। [উমদাতুত তাফসীর ১/২২৫)০

💠 তবে ইমাম আলবানী হাদিসটিকে জঈফ বা দুর্বল বলেছেন। (জঈফ ইবনে মাজাহ হা/৩৪৫)

মোটকথা, হাদিসটি সহীহ/জঈফ হওয়ার ব্যাপারে মুহাদ্দিসদের মাঝে দ্বিমত দেখা যাচ্ছে।আল্লামা আলবানী রহ. এটিকে সনদগতভাবে জঈফ সাব্যস্ত করলেও ইমাম বূসীরী, ইবনে হাজার আসকালানী, আহমদ শাকের সহ কতিপয় মুহাদ্দিস সহীহ/হাসান হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন।

ইফতারের সময় মানুষ ক্লান্ত-শ্রান্ত থাকে, ক্ষুধা-পিপাসায় কাতর থাকে। এমন কষ্টকর পরিস্থিতিতে দুআ করলে তা কবুলের সম্ভাবনা থাকে-যেমনটি বলেছেন আল্লামা উসাইমীন রহ.।

মোটকথা, এ হাদিসটিকে জঈফ ধরে নিলেও ছিয়াম অবস্থায় দুআ কবুলের সহীহ হাদিস অনুযায়ী এবং ইফতারের আগে ছায়িমদের দুর্বল অবস্থায় থাকার পরিপ্রেক্ষিতে ইফতারের পূর্বে দুআ করলে কবুল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ইংশাআল্লাহ। তাই ছায়িমদের উচিৎ, সারা দিন ছিয়াম অবস্থায় দুয়া করার সুযোগকে হাত ছাড়া না করা। বিশেষ করে ইফতারে আগের সময়টিকে দুআর জন্য বেশি গুরুত্ব দেয়া। আল্লাহু আলাম। 

▬▬▬▬◆◈◆ ▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি,
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব

Friday, May 1, 2020

প্রচলিত ইফতারের দুয়ার তাহকীক

ইফতারের দুআ,

اللهم لك صمت وعلى رزقك أفطرت               

 "আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু অ আলা রিযক্বিকা আফত্বরতু"এই দুআ
তাহক্কীক্ব:- মুসলেহুদ্দীন মাযহারী

প্রিয় পাঠক!

সমাজে বহুল প্রচলিত এই দুআটির বিস্তারিত তাহক্বীক্ব চলুন দেখি।

হাদীসটি হলো:-

১) এই হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ রহঃ উল্লেখ করেছেন:-
حدثنا مسدد حدثنا هشيم عن حصين عن معاذ بن زهره انه بلغه ان النبي صلى الله عليه وسلم كان اذا افطر قال اللهم لك صمت وعلى رزقك افطرت( سنن ابي داود ٢/٣٠٦ رقم الحديث ٢٣٥٨)

অর্থাৎ:-

২৩৫৮। মুয়ায ইবনু যুহরা (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তাঁর নিকট হাদীস পৌঁছেছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইফতারের সময় বলতেনঃ ‘‘আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়া ‘আলা রিযকিকা আফতারতু।’’ অর্থঃ হে আল্লাহ! আমি আপনার উদ্দেশ্যেই সওম পালন করেছি এবং আপনার দেয়া রিযিক দ্বারাই ইফতার করেছি।

তাখরীজ:-

( সুনান আবী দাউদ ২/৩০৬ হাদীস নং ২৩৫৮ আস সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৪/৪০৩ হাদীস নং ৮১৩৪ আয যুহ্দ অর রক্বাইক্ব লিইবনিল মুবারাক ১/৪৯৫ হাদীস নং ১৪১০ আল মারাসীল লি আবী দাউদ ১/১২৪ হাদীস নং ৯৯ শারহুস সুন্নাহ লিল বাগাবী ৬/২৬৫ হাদীস নং ১৭৪১ আদ দা'ওয়াতুল কাবীর লিল বায়হাক্বী ২/৯৮ হাদীস নং ৫০০ ফাযাইলুল আওকাত লিল বায়হাক্বী ১/৩০১ হাদীস নং ১৪৩ শুআবুল ঈমান লিল বায়হাক্বী ৫/৪০৫ )।

তাহক্বীক্ব:-এই হাদীস যঈফ:-
কারণ:-
উক্ত হাদীসের সমস্ত সানাদে বা সুত্রে "معاذ بن زهرة" "মুআয বিন যুহরাহ" রাবী রয়েছেন।

এই রাবী সম্পর্কে মুহাদ্দিসীনে কিরামদের উক্তি:-

১/ ইমাম ইবনে হাজার আসক্বালানী রহঃ বলেন,মাক্ববূল, তৃতীয় স্তরের, তিনি হাদীস ইরসাল করেছেন।তারা ভুলে পতিত হয়েছেন যারা তাঁকে সাহাবাহ উল্লেখ করেছেন ( তাক্বরীবুত তাহযীব রাবী নং ৭৫৮২ রুয়াতুত তাহযিয়্যীন ৬৭৩১)।

২) ইমাম বুখারী রহঃ আলী ইবনুল মাদীনী রহঃ থেকে বলেন, তাঁর হাদীস মুরসাল ( আল ইসাবাহ ফী তাময়ীযিস সাহাবাহ ৬/২৮৫ রাবী নং ৮৬০১)।

৩) ইমাম জা'ফার রহঃ বলেন, তিনি তাবিঈদের অন্তর্ভুক্ত।যারা তাঁকে সাহাবাহ বলেছেন তাঁরা ভুল করেছেন ( ইকমাল তাহযীবিল কামাল ১১/২৪৯ রাবী নং ৪৬১৮)।

প্রিয় পাঠক মন্ডলী!
উক্ত উদ্ধৃতি থেকে মুহাদ্দিসীনে কিরামদের উক্তি পেলাম যে,"মুআয বিন যুহরাহ" তাবিঈ।

প্রিয় পাঠক!

এবারে আসুন জেনে নিন যে,
তাবিঈ কাকে বলে।

هو من لقي صحابيا مسلماً و مات على الإسلام وقيل هو من صحب الصحابي ( تيسير مصطلح الحديث ٢٤٧ص)

অর্থাৎ:- যিনি মুসলিম অবস্থায় সাহাবীর সাক্ষাৎ বা সান্নিধ্য পেয়েছেন এবং ইসলামের উপর মৃত্যু বরণ করেছেন, এবং এটা বলা হয় যে, যিনি সাহাবীর সংস্পর্শ পেয়েছেন তিনি তাবিয়ী( তাইসীরু মুসত্বলাহিল হাদীস ২৪৭ পৃষ্ঠা )।

উক্ত সংজ্ঞা থেকে আমরা জানতে পারলাম যে,তাবিঈ হলেন যিনি সাহাবীর সংস্পর্শ পেয়েছেন।
অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংস্পর্শ বা সাক্ষাৎ কিছুই পাননি।

আর এই মুআয বিন যুহরাহ তাবিঈ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে না দেখেও মধ্যে সাহাবীর নাম উল্লেখ না করেই বলছেন যে, তাঁর নিকট হাদীস পৌঁছেছে!
তিনি কোন সাহাবীর নাম উল্লেখ করেননি।
এই ধরণের হাদীসকে মুরসাল হাদীস বলা হয়।

المرسل
هو ما سقط من آخر إسناده من بعد التابعي
অর্থাৎ:-
মুরসাল হল:- তাবিঈর পরে সানাদে শেষে যা বিলুপ্ত করা হয়।
আর সেটা হলো :-
والذي بعد التابعي هو الصحابي، وآخر الإسناد هو طرفه الذي فيه الصحابي .
অর্থাৎ:- যিনি তাবিয়ীর পর তিনি হলেন সাহাবী,আর সানাদের শেষ প্রান্তে সাহাবী থাকেন ( তাইসীরু মুসত্বলাহিল হাদীস ৮৭ পৃষ্ঠা নুযহাতুন নাযার ৪৩ পৃষ্ঠা)।

প্রিয় পাঠক মন্ডলী!

মুরসাল হাদীসের সংজ্ঞা সম্পর্কেও আমরা অবগত হলাম ।

এবারে আসুন মুরসাল হাদীসের হুকুম সম্পর্কে জেনে নিই।

المرسل في الأصل ضعيف مردود ،لفقد شرطا من شروط المقبول، وهو اتصال السند

অর্থাৎ:- মুরসাল আসলেই যঈফ প্রত্যাখ্যাত, হাদীস গ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্ত বিলুপ্ত হওয়ার জন্য,আর সেটা হলো মিলিত সানাদ ( তাইসীরু মুসত্বলাহিল হাদীস ৮৮ পৃষ্ঠা)।

ইবনুস স্বলাহ রহঃ বলেন,
اعلم أن حكم المرسل حكم الحديث الضعيف ( مقدمة ابن الصلاح ١/٥٣).
জেনে নিন নিশ্চয় মুরসাল হাদীসের হুকুম হলো যঈফ হাদীসের হুকুম ( মুক্বাদ্দামা ইবনিস স্বলাহ ১/৫৩)।

ইমাম মুসলিম রহঃ বলেন,
المرسل في أصل قولنا وقول أهل العلم بالأخبار ليس بحجة ( صحيح مسلم ١/٢٢)
আমাদের এবং বিদ্বানদের মৌলিক কথা হলো মুরসাল দলীলযোগ্য নয় ( মুক্বাদ্দামা সহীহ মুসলিম ১/২২ মুক্বাদ্দামা ইবনিস স্বলাহ মা'রিফাতু আনওয়াঈ উলূমিল হাদীস ১/৫৫)।

ইমাম নববী রহঃ বলেন,
ثم المرسل حديث ضعيف عند جماهير المحدثين وكثير من الفقهاء و أصحاب الأصول ( تقريب النووي مع تدريب الراوي ١/١٩٨).
অতঃপর মুরসাল হাদীস অধিকাংশ মুহাদ্দিস, প্রচুর ফক্বীহ এবং উসূলবিদ উলামায়ে কেরামদের নিকট যঈফ ( তাক্বরীবুন নববী মাআ তাদরীবির রাবী ১/১৯৮)।

আল্লামাহ নাসিরুদ্দীন আলবানী রহঃ বলেন,
إن الحديث المرسل من أقسام الحديث الضعيف عند جمهور علماء الحديث ( سلسلة الأحاديث الضعيفة ١/٥٥).
নিশ্চয় মুরসাল হাদীস জমহুর মুহাদ্দিসীনে কিরামদের নিকট যঈফ হাদীসের অংশ ( সিলসিলা যঈফাহ ১/৫৫)।

হাফিয যুবাইর আলী যাঈ রহঃ মুরসাল হাদীস গ্রহণযোগ্য নয় এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ( তাহক্বীক্বী ইসলাহী আওর ইলমী মাক্বালাত ৬/৪৭৫ ফাতাওয়া আল ইলমিয়্যাহ ২/২৯০)।
প্রিয় পাঠক! লেখনীর কলেবর বৃদ্ধি না করে বলতে চাই মুরসাল হাদীস গ্রহণযোগ্য যারা বলছেন তাঁরা ভালো করে (ফাতাওয়া আল ইলমিয়্যাহ লিহাফিয যুবাইর আলী যাঈ রহঃ ২/২৯০-২৯৩ পৃষ্ঠা) পড়ুন।

মুরসাল হাদীস সর্ব সম্মতিক্রমে যঈফ।
বিস্তারিত জানতে দেখুন:-

( মুক্বাদ্দামাহ মুসলিম ১/২২ জামিউত তাহসীল ৩৫ আল বায়িসুল হাসীস ১/১৪২ শারহুল মুহাযযাব ১/৯৫ মা'রিফাতু উলূমিল হাদীস ২৫ পৃষ্ঠা মুক্বাদ্দামাহ ইবনিস স্বলাহ ১/৫৩ আত তাক্বরীব অত তাইসীর লিন নববী ১/৩৪ আল বায়িসুল হাসীস ইলা ইখতিসারি উলূমিল হাদীস ১/৪৮)।

অতএব " আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু অ আলা রিযক্বিকা আফত্বরতু" এই দুআটি মুরসালে তাবিয়ী।
যা সর্ব সম্মতিক্রমে যঈফ।

প্রকাশ থাকে যে,মুরসালে সাহাবী হুজ্জাত বা গ্রহণযোগ্য ( আন নুকাত আলা মুক্বাদ্দামাতিবনিস স্বলাহ ১/৫০৮ শারহু ইলালিত তিরমিযী ২/৬০১)।

প্রিয় পাঠক মন্ডলী !
উপরোক্ত উসূল থেকে এই হাদীসটি যঈফ হিসেবেই প্রমাণিত হলো আলহামদুলিল্লাহ।

এই হাদীস যঈফ বলেছেন যে সমস্ত মুহাদ্দিসীনে কিরাম।

১) আল্লামাহ নাসিরুদ্দীন আলবানী রহঃ যঈফ বলেছেন ( যঈফ আবী দাউদ ২/২৬৪ হাদীস নং ৪০৬ যঈফুল জামে হাদীস নং ৪৩৪৯ তাখরীজ আল কালিমিত তইয়্যিব ১/১৩৯ হাদীস নং ১৬৫ )।

আল্লামাহ নাসিরুদ্দীন আলবানী রহঃ মিশকাতের হাদীস নং ১৯৯৪ টিকা নং ৫ এর প্রথম তাহক্বীক্বে বলেছিলেন,
ولكن له شواهد يقوي بها
এটা মুরসাল। কিন্তু এর সমার্থক বর্ণনার কারণে এটা শক্তিশালী।
পরবর্তীতে আল্লামাহ নাসিরুদ্দীন আলবানী রহঃ মিশকাতের দ্বিতীয় তাহক্বীক্ব করেন এবং বইটির নাম দেন "هداية الرواة" হিদায়াতুর রুয়াত।
এই বইয়ের ১৯৩৫ নং হাদীসের ৩ নং টিকায় বলেন,
ثم تبين لي أن الشواهد مشار إليها أنس و إبن عباس لضعف شديد فصلت في الارواء رقم الحديث ٩١٩
আমার কাছে স্পষ্ট হলো যে,যেই সমার্থকের দিকে ইঙ্গিত করেছিলাম,আনাস এবং ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহুমা এর হাদীসের দিকে সেটা নিতান্তই দূর্বল।এই সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি ইরওয়াউল গালীল হাদীস নং ৯১৯ এ ।
অর্থাৎ আলবানী রহঃ মিশকাতের দ্বিতীয় তাহক্বীক্বে এই হাদীস যঈফ বলেছেন।
তিনি প্রথমে শক্তিশালী বলার পর প্রত্যাবর্তন করেছেন অর্থাৎ যঈফ বলেছেন ( তারাজুআত আল আলবানী ১/১৩ হাদীস নং ৩৫,৩৮)।

২) হাফিয যুবাইর আলী যাঈ রহঃ বলেন,সানাদ যঈফ ( আনওয়ারুস সহীফাহ ফিল আহাদীসিয যঈফাহ, যঈফ আবী দাউদ হাদীস নং ২৩৫৮)।

প্রিয় পাঠক মন্ডলী!

এবারে চলুন দেখি এই সম্পর্কিত একটি হাদীসের সানাদ।
ইমাম ত্ববারানী রহঃ মৃত ৩৬০ হিজরী এই হাদীসটি উল্লেখ করেছেন,
حدثنا محمد بن ابراهيم ،ثنا اسماعيل بن عمرو البجلي ،نا داود بن الزبرقان ،نا شعبة عن ثابت البناني عن أنس بن مالك قال : كان النبي صلى الله عليه وسلم إذا أفطر قال : اللهم لك صمت وعلى رزقك أفطرت ( المعجم الاوسط ٧/٢٩٨ رقم الحديث ٧٥٤٩ المعجم الصغير للطبراني ٢/١٣٣ رقم الحديث ٩١٢).

এই হাদীসের সানাদে " داود بن الزبرقان" "দাউদ বিন যাবারক্বান"রয়েছে।
এই কারণেই আলবানী বলেছেন এই হাদীস নিতান্তই দূর্বল ( হিদায়াতুর রুয়াত হাদীস নং ১৯৩৫)।

প্রিয় পাঠক মন্ডলী!
চলুন এই রাবী সম্পর্কে মুহাদ্দিসীনে কিরামদের উক্তি জেনে নিই।
আল্লামাহ্ আযদী রহঃ তাকে মিথ্যুক বলেছেন ( রুয়াতুত তাহযিয়্যীন ১৭৮৫)।

ইমাম ইবনু হাজার আসক্বালানী রহঃ বলেন,মাতরুক বা পরিত্যক্ত ( তাক্বরীবুত তাহযীব রাবী নং ১৯৫৫)।
তাক্বরীবুত তাহযীবের মুহাক্বিক্ব শায়খ খলীল মা'মূন শীহা রহঃ এই হাদীসের টিকায় উল্লেখ করেছেন।
ইমাম ইবনু মাঈন রহঃ বলেন,সে কিছুই নয়।
আল্লামাহ জূযজানী রহঃ বলেন সে মিথ্যুক।
ইমাম আবু দাউদ যঈফ বলেছেন।
ইমাম নাসাঈ রহঃ বলেন,সে শক্তিশালী নয়।
আল্লামাহ ইজলী রহঃ বলেন,যঈফুল হাদীস।
ইমাম বাযযার রহঃ বলেন,মুনকারুল হাদীস ( বিস্তারিত এই সমস্ত গ্রন্থে পাবেন তারীখ আদ দূরী ২/১৫২ আহওয়ালুর রিজাল ১৮২ আল জারহু অত তা'দীল ৩/৪১২ আল কামিল ৩/৯৫ আল মাজরুহীন ১/২৯২)।

ইবনু খিরাশ রহঃ বলেন,যঈফুল হাদীস ( ইকমাল তাহযীবিল কামাল ৪/২৪৯ রাবী নং ১৪৪৪)।

ইমাম আবু হাতিম রহঃ বলেন,যঈফ ( তারীখুল ইসলাম ৪/৬১৫)।

ইমাম আবু যুরআহ রহঃ বলেন,মাতরুক বা পরিত্যক্ত ( মীযানুল ই'তিদাল ২/৭ রাবী নং ২৬০৬)।
প্রিয় পাঠক মন্ডলী!
এবারে চলুন দেখি এই হাদীস যঈফ বলেছেন যে সমস্ত মুহাদ্দিসীনে কিরাম।

ইমাম হায়সামী রহঃ যঈফ বলেছেন ( মাজমাউয যাওয়াইদ ৩/১৫৬ হাদীস নং ৪৮৯২)।

ইমাম ইবনু হাজার আসক্বালানী রহঃ যঈফ বলেছেন ( তালখীসুল হাবীর ২/৪৪৫)।

আল্লামাহ নাসিরুদ্দীন আলবানী রহঃ যঈফ বলেছেন ( ইরওয়াউল গালীল ৪/৩৮ হাদীস নং ৯১৯ সিলসিলা যঈফাহ হাদীস নং ৬৯৯৬)।

প্রিয় পাঠক! উক্ত আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস "দাউদ বিন যাবারক্বান" রাবীর কারণে যঈফ প্রমাণিত হলো।

প্রিয় পাঠক মন্ডলী! এবারে চলুন দেখি

ইবনু আব্বাস রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসের অবস্থা।
এই হাদীসটি হলো:-

حدثنا محمد بن عبد الله الحضرمي،ثنا يوسف بن قيس البغدادي،ثنا عبد الملك بن هارون بن عنترة،عن أبيه عن جده عن إبن عباس قال : كان النبي صلى الله عليه وسلم إذا أفطر قال: لك صمت،وعلى رزقك أفطرت فتقبل مني إنك أنت السميع العليم ( المعجم الكبير للطبراني ١٢/١٤٦ رقم الحديث ١٢٧٢٠)

অর্থাৎ:- ইবনু আব্বাস রাঃ বলেন,নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ইফতার করতেন বলতেন,লাকা সুমতু অ আলা রিযক্বিকা আফত্বরতু ফাতাক্বব্বাল মিন্নী ইন্নাকা আনতাস সামীউল আলীম ( আল মু' জামুল কাবীর লিত ত্ববারানী ১২/১৪৬ হাদীস নং ১২৭২০)।

এই হাদীস নিতান্তই যঈফ বা জালের কাছাকাছি।
কারণ:-
এই হাদীসের সানাদে মিথ্যুক রাবী রয়েছে।
১) আব্দুল মালিক বিন হারুন

ইমাম সা'দী রহঃ বলেন, আব্দুল মালিক বিন হারুন দাজ্জাল কাযযাব ( মীযানুল ই'তিদাল ২/৬৬৬)।

ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল রহঃ বলেন,যঈফুল হাদীস ( আল কামিল ফী যুআফাইর রিজাল ৬/৫২৯ রাবী নং ১৪৪৮)।

ইমাম বুখারী রহঃ বলেন,মুনকারুল হাদীস ( আত তারীখুল কাবীর ৫/৪৩৬ রাবী ১৪২৩)।

ইমাম বারক্বানী রহঃ বলেন, ইমাম দারাক্বুতনী রহঃ কে আব্দুল মালিক বিন হারুন বিন আনতারাহ সম্পর্কে আমি জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বললেন, পরিত্যক্ত মিথ্যুক ( মাউসূআতু আক্বওয়ালি আবিল হাসান আদ দারাক্বুতনী ২/৪২৬ রাবী নং ২২৪২)।

প্রিয় পাঠক মন্ডলী!
এবারে চলুন দেখি এই হাদীস কোন কোন মুহাদ্দিস যঈফ বলেছেন।

১) ইমাম হায়সামী রহঃ যঈফ বলেছেন ( মাজমাউয যাওয়াইদ ৩/১৫৬ হাদীস নং ৪৮৯৩)।

২) ইবনু হাজার আসক্বালানী রহঃ যঈফ বলেছেন ( তালখীসুল হাবীর ২/৪৪৪)।

৩) ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম আলজাওযী রহঃ বলেন, প্রমাণিত নয় বা সাব্যস্ত নয় ( যাদুল মাআদ ২/৪৯)।

৪) আল্লামাহ নাসিরুদ্দীন আলবানী রহঃ নিতান্তই দূর্বল বলেছেন ( ইরওয়াউল গালীল হাদীস নং ৯১৯ যঈফুল জামে হাদীস নং ৪৩৫০ )।

প্রিয় পাঠক মন্ডলী!
এবারে চলুন আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে এই দুআটা ইফতারের পর পড়ার মর্মে বর্ণিত হাদীসটির অবস্থা দেখি।

আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন,

يا علي وإذا كنت صائماً في شهر رمضان فقل بعد افطارك : اللهم لك صمت،وعليك توكلت،وعلى رزقك أفطرت( اتحاف الخيرة المهرة للبوصيري ٣/٤١٣ رقم الحديث ٣٠٠٤).

অর্থাৎ:- হে আলী,যখন তুমি রমাযান মাসে সিয়াম থাকবে তুমি ইফতারের পর বলো, আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু,অ আলাইকা তাওয়াক্কালতু,অ আলা রিযক্বিকা আফত্বরতু ( ইতহাফুল খিয়ারাতিল মাহারাহ লিল বূসীরী ৩/৪১৩ হাদীস নং ৩০০৪ আল মাতালিবুল আলিয়াহ ৬/১৪১ হাদীস নং ৩১০৭৪)।

এই হাদীস জাল।

কারণ,এই হাদীসের সানাদে তিনজন যঈফ রাবী রয়েছেন ।
লেখক এই হাদীসের শেষেই এই কথা উল্লেখ করেছেন ।
১) আব্দুর রাহীম বিন ওয়াক্বিদ।
২) হাম্মাদ বিন আমর।
৩) আস সার্রি ইবনু খালিদ।
( ইতহাফুল খিয়ারাতিল মাহারাহ হাদীস নং ৩০০৪)।

খাতীব বাগদাদী রহঃ বলেন,আব্দুর রাহীম বিন ওয়াক্বিদের হাদীস মুনকার ( তারীখুল ইসলাম ৫/৩৭৩ রাবী নং ২৩০ তারীখে বাগদাদ ১২/৩৭০ রাবী নং ৫৭২০ মীযানুল ই'তিদাল ২/৬০৭ রাবী নং ৫০৩৮)।

২) হাম্মাদ বিন আমর হাদীস জালকারী মিথ্যুক।
( তারীখুল ইসলাম ৪/৮৩৯ রাবী নং ৮৩)।

ইমাম বুখারী রহঃ বলেন,মুনকারুল হাদীস
( আত তারীখুল কাবীর ৩/২৮ রাবী ১১৭)।

ইমাম নাসাঈ রহঃ বলেন,মাতরূকুল হাদীস ।
ইবনে হিব্বান রহঃ বলেন, হাদীস জালকারী ছিল ( মীযানুল ই'তিদাল ১/৫৯৮ রাবী নং ২২৬২)।

আলিয়্যিবনুল হাজার রহঃ বলেন,যঈফ ( আল কামিল ফী যুআফাইর রিজাল ৩/১০ রাবী নং ৪১৫)।
এই হাদীসটিকে ইমাম সুয়ূতী রহঃ ( আল আ'লী আল মাসনূআহ ফিল আহাদীসিল মাউযুআহ ২/৩১২) উল্লেখ করেছেন।
প্রিয় পাঠক! আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে এই বর্ণনা জাল হিসাবে প্রমাণিত হলো।

প্রিয় পাঠক মন্ডলী!
এবারে আসুন একটা মূলনীতি বা উসূল দেখে নিন।

ইমাম ইয়াহ্ইয়া ইবনু সাঈদ আল ক্বাত্তান রহঃ বলেন,
لا تنظروا إلى الحديث ولكن أنظروا إلى الإسناد فإن صح الإسناد وإلا فلا تغتر بالحديث إذا لم يصح الإسناد ( الجامع لأخلاق الراوي للخطيب البغدادي ٢/١٠٢ رقم ١٣٠١ تحرير علوم الحديث ١/٢٤).

অর্থাৎ:- তোমরা হাদীসের দিকে দেখ না বরং সানাদের দিকে দেখ,তার সুত্র সহীহ না হলে ধোঁকায় পতিত হবে না ( আল জামি লিআখলাক্বির রাবী ২/১০২ নং ১৩০১ তাহরীরু উলূমিল হাদীস ১/২৪)।

প্রিয় পাঠক এই উসূল থেকে প্রমাণিত হলো যে,কেউ যদি এই সমস্ত হাদীস সহীহ বলেন,তা দেখে ধোঁকায় পতিত হলে হবে না।
সার কথা:-
ইফতারের দুআ "আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু অ আলা রিযক্বিকা আফত্বরতু" উসূলে হাদীসের মানদণ্ডে যঈফ এবং এর প্রত্যেকটা সানাদ যঈফ থেকে আরো নিতান্তই যঈফের দিকেই এগিয়ে গেলো।

যে ১৫ টি কারনে ছিয়াম ভাঙ্গে না, অথচ অনেকে মনে করে ভেঙ্গে যায়

যে ১৫ টি কারণে ছিয়াম / রোজা ভাঙে না (অথচ অনেকেই মনে মনে করেন—এসব কারণে রোজা ভেঙে যায়) [সরাসরি হাদিস থেকে]
.
(এক.)
অনিচ্ছাকৃত বমি হলে (মুখ ভরে হলেও) রোযা ভাঙবে না। তেমনি বমি কণ্ঠনালীতে এসে নিজে নিজে ভেতরে ঢুকে গেলেও রোযা ভাঙবে না। [তিরমিযি: ১/১৫৩, ৭২০ নং হাদিস দ্রষ্টব্য]
.
(দুই.)
স্বপ্নদোষ হলে, শরীর থেকে রক্ত বের হলে, শিঙ্গা লাগালে (রক্ত দিলে) রোজা ভাঙবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘তিনটি বস্তু রোজা ভঙ্গ করবে না: বমি, সিঙ্গা লাগানো ও স্বপ্নদোষ।’’ [বাযযার সূত্রে ফিকহুস সুনানি ওয়াল আসার: ১২৯১, হাদিসটি সহিহ]
.
তবে রক্ত দিলে যদি শরীর দুর্বল হয়ে যায়, তবে রোজা মাকরূহ হবে; রোজা ভাঙবে না। [সহিহ বুখারির ১৯৪০ নং হাদিস দ্রষ্টব্য]
.
আলিমগণের একাংশ শিঙ্গা লাগানো (হিজামা করানো) এবং বমি করাকে রোজা ভঙের কারণ বলেছেন। তবে, হানাফি ফিকহে তা রোজা ভঙের কারণ নয়। কারণ হাদিসে এসেছে, ‘‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমতাবস্থায় শিঙ্গা লাগিয়েছেন, যখন তিনি রোজাদার।’’ [সহিহ বুখারির সূত্রে ফিকহুস সুনানি ওয়াল আসার: ১২৯০]
.
(এ প্রসঙ্গে আমাদের (Tasbeeh) পেইজে আলাদা একটি পোস্ট আসতে পারে। যেহেতু পক্ষে-বিপক্ষে হাদিস আছে, সেহেতু, একটা পর্যালোচনা হতে পারে)
.
অন্য হাদিসে এসেছে, ‘‘যে ব্যক্তি রোজাদার অবস্থায় অনিচ্ছাবশত বা বাধ্য হয়ে বমি করবে, তার কাযা করতে হবে না।’’ [আবু দাউদ, ইবনু মাজাহ, ফিকহুস সুনান: ১২৯৪, হাদিসটি সহিহ]
.
(তিন.)
সুরমা, কাজল, সুগন্ধি ইত্যাদির দ্বারা রোজার কোন ক্ষতি হয় না। আনাস ইবনু মালিক (রা.) রোজাদার অবস্থায় সুরমা ব্যবহার করতেন। [আবু দাউদ, ফিকহুস সুনান: ১৩০৫, সনদ হাসান] [ইবনু তাইমিয়্যাহ, হাকীকাতুস সিয়াম, পৃষ্ঠা: ৪০-৪১]
.
(চার.)
মশা, মাছি, ধুলাবালি, কীটপতঙ্গ ইত্যাদি অনিচ্ছাকৃতভাবে গলা বা পেটে ঢুকে গেলে রোজা ভাঙবে না। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘‘কারো গলায় মাছি ঢুকে গেলে রোযা ভাঙবে না।’’ [ইবনু আবি শায়বা, আল মুসান্নাফ: ৬/৩৪৯] [রমযান মাসের ৩০ আসর, পৃষ্ঠা: ১৫৩]
.
(পাঁচ.)
ভুলে কিছু পানাহার করলে রোজা ভাঙবে না। হাদিসে এসেছে, ‘‘যে রোজাদার ভুলে পানাহার করলো, সে যেন তার রোজা পূর্ণ করে; কেননা আল্লাহই তাকে পানাহার করিয়েছেন’’ [সহিহ বুখারি: ১৯৩৩, সহিহ মুসলিম: ১১৫৫]
.
(ছয়.)
শরীর বা মাথায় তেল ব্যবহার করলে রোজা ভাঙবে না। [আবদুর রাযযাক, আল মুসান্নাফ: ৪/৩১৩]
.
(সাত.)
রোজা অবস্থায় অজ্ঞান, বেহুঁশ বা অচেতন হলে রোজা ভাঙবে না। [বাইহাকি, সুনানুল কুবরা: ৪/২৩৫]
.
(আট.)
রোজা অবস্থায় মিসওয়াক (কাঁচা বা পাকা ডাল যাই হোক) করলে রোজার কোন সমস্যা নেই। এমনকি ইফতারের পূর্বে করলেও অসুবিধা নেই। [সহিহ বুখারি: ১/২৫৯, আবদুর রাযযাক, আল মুসান্নাফ: ৪/২০২]
.
[টুথপেস্টের মাসআলাটি ভিন্নভাবে আসতে পারে। আল্লাহই তাওফিকদাতা]
.
(নয়.)
নাইট্রোগ্লিসারিন-জাতীয় ইনহেলারে রোজা ভাঙবে না, তবে ভেনটোলিন ইনহেলারে রোজা ভেঙে যাবে, কারণ এর কিছু অংশ খাদ্যনালীতে প্রবেশ করে। [মাসিক আল কাউসার সূত্রে ‘রমযান মাসের উপহার’ মাওলানা হাবীবুর রহমান]
.
(দশ.)
নাকে ড্রপ, স্প্রে ব্যবহারের পর তা যদি গলার ভিতরে চলে যায়, তবে রোজা ভেঙে যাবে। অবশ্য গলায় না গেলে বা স্বাদ অনুভূত না হলে রোজা ভাঙবে না। [মাজাল্লাতু মাজমা‘ইল ফিকহিল ইসলামী: ২/৪৫৪, মাসিক আলকাউসার সূত্রে ‘রমযান মাসের উপহার’]
.
(এগারো.)
খাবার ঠিকঠাক আছে কীনা তা বোঝার জন্য ঘ্রাণ নিলে রোজা ভাঙবে না। ইবনু উসাইমীন (রাহ.) বলেন, ‘খাবারের স্বাদ গ্রহণ করলে রোজা ভাঙবে না। যদি গিলে ফেলা না হয়।’ [রমযান মাসের ৩০ আসর, পৃষ্ঠা: ১৫৫]
.
তবে, বাধ্য না হলে এমনটি করা মাকরূহ। যথাসম্ভব বিরত থাকতে হবে।
.
(বারো.)
রোজা অবস্থায় নখ বা চুল কাটতে কোনো সমস্যা নেই। মেয়েরা হাতে-পায়ে মেহেদী দিলেও রোজার কোনো ক্ষতি হবে না। [শায়খ আহমাদ মূসা জিবরিলের রিসালাহ]
.
(তেরো.)
সহবাস ছাড়া স্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ঠ হলে রোজা ভাঙবে না। তবে বীর্যপাত হওয়া যাবে না। আয়িশা (রা.) বলেন, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোজাদার অবস্থায় (স্ত্রীকে) চুমু খেতেন এবং আলিঙ্গন করতেন। তবে, নিজ আবেগ-উত্তেজনার উপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ ছিলো তোমাদের সবার চেয়ে বেশি।’’ [সহিহ বুখারি ও মুসলিম,  ফিকহুস সুনান: ১২৯৫]
.
তবে সাবধান! এটি অনেক বেশি রিস্কি ব্যাপার। বীর্যপাত হওয়া বা সহবাসের দিকে আগ্রহী হওয়ার ন্যূনতম সম্ভাবনা থাকলেও এ থেকে বিরত থাকতে হবে।
.
(চৌদ্দ.)
রাতে সহবাস করতে কোনো অসুবিধা নেই। এমনকি সহবাসের পর গোসল না করে সাহরি খেয়ে ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার পর গোসল করলেও সমস্যা নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এই কাজটি সাব্যস্ত আছে। [সহিহ বুখারি ও মুসলিম, ফিকহুস সুনান: ১৩০৪]
.
(পনেরো.)
গরমের কারণে, শরীর ঠাণ্ডা করতে একের অধিকবার গোসল করতেও সমস্যা নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এই কাজটির প্রমাণ আছে। [মুয়াত্তা ইমাম মালিক: ২/২৯৪, আবু দাউদ: ২৩৬৫]
.
#Tasbeeh

Thursday, April 30, 2020

ছিয়াম অবস্থায় ভুলবশত কিছু খেয়ে ফেললে কি ছিয়াম ভাঙ্গবে?

❓প্রশ্নঃ ছিয়াম অবস্থায় ভুলবশত কিছু খেয়ে ফেললে কি ছিয়াম ভাঙ্গবে?

উত্তরঃ না, ভাঙ্গবে না।

باب مَا جَاءَ فِي الصَّائِمِ يَأْكُلُ أَوْ يَشْرَبُ نَاسِيًا حَدَّثَنَا أَبُو سَعِيدٍ الأَشَجُّ، حَدَّثَنَا أَبُو خَالِدٍ الأَحْمَرُ، عَنْ حَجَّاجِ بْنِ أَرْطَاةَ، عَنْ قَتَادَةَ، عَنِ ابْنِ سِيرِينَ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ "‏ مَنْ أَكَلَ أَوْ شَرِبَ نَاسِيًا فَلاَ يُفْطِرْ فَإِنَّمَا هُوَ رِزْقٌ رَزَقَهُ اللَّهُ ‏"‏ ‏.‏

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লহ (ছঃ) বলেছেনঃ
ভুলবশতঃ যে লোক (ছিয়াম / রোযা থাকা অবস্থায়) কিছু খায় বা পান করে সে যেন ছিয়াম ভেঙ্গে না ফেলে। কেননা, এটা এমন এক রিযিক যা আল্লাহ তা'আলা তাকে ভোজন করিয়েছেন।

গ্রন্থঃ সূনান আত তিরমিজী [তাহকীককৃত]
অধ্যায়ঃ ৬/ রোযা (সাওম) (كتاب الصوم عن رسول الله ﷺ)
হাদিস নম্বরঃ ৭২১
— সহীহ, ইবনু মা-জাহ (১৬৭৩), নাসা-ঈ
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

তবে, স্মরণ হওয়ার সাথে সাথেই খাওয়া বা পান করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। তা না হলে ছিয়াম ভেঙ্গে যাবে।  

ছিয়াম (রোযা) ভঙ্গের কারণসমূহ

প্রশ্ন: ছিয়াম / রোযা ভঙ্গের কারণগুলো সংক্ষেপে উল্লেখ করবেন?

উত্তরঃ আলহামদুলিল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা পরিপূর্ণ হেকমত অনুযায়ী রোযার বিধান জারী করেছেন। তিনি রোযাদারকে ভারসাম্য রক্ষা করে রোযা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন; একদিকে যাতে রোযা রাখার কারণে রোযাদারের শারীরিক কোন ক্ষতি না হয়। অন্যদিকে সে যেন রোযা বিনষ্টকারী কোন বিষয়ে লিপ্ত না হয়।

এ কারণে রোযা-বিনষ্টকারী বিষয়গুলো দুইভাগে বিভক্ত:

কিছু রোযা-বিনষ্টকারী বিষয় রয়েছে যেগুলো শরীর থেকে কোন কিছু নির্গত হওয়ার সাথে সম্পৃক্ত। যেমন- সহবাস, ইচ্ছাকৃত বমি করা, হায়েয ও শিঙ্গা লাগানো। শরীর থেকে এগুলো নির্গত হওয়ার কারণে শরীর দুর্বল হয়। এ কারণে আল্লাহ তাআলা এগুলোকে রোযা ভঙ্গকারী বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করেছেন; যাতে করে এগুলো নির্গত হওয়ার দুর্বলতা ও রোযা রাখার দুর্বলতা উভয়টি একত্রিত না হয়। এমনটি ঘটলে রোযার মাধ্যমে রোযাদার ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং রোযা বা উপবাসের ক্ষেত্রে আর ভারসাম্য বজায় থাকবে না।

আর কিছু রোযা-বিনষ্টকারী বিষয় আছে যেগুলো শরীরে প্রবেশ করানোর সাথে সম্পৃক্ত। যেমন- পানাহার। তাই রোযাদার যদি পানাহার করে তাহলে যে উদ্দেশ্যে রোযার বিধান জারী করা হয়েছে সেটা বাস্তবায়িত হবে না।[মাজমুউল ফাতাওয়া ২৫/২৪৮]

আল্লাহ তাআলা নিম্নোক্ত আয়াতে রোযা-বিনষ্টকারী বিষয়গুলোর মূলনীতি উল্লেখ করেছেন:

“এখন তোমরা নিজ স্ত্রীদের সাথে সহবাস কর এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা কিছু লিখে রেখেছেন তা (সন্তান) তালাশ কর। আর পানাহার কর যতক্ষণ না কালো সুতা থেকে ভোরের শুভ্র সুতা পরিস্কার ফুটে উঠে...”[সূরা বাকারা, আয়াত: ১৮৭]

এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা রোযা-নষ্টকারী প্রধান বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন। সেগুলো হচ্ছে- পানাহার ও সহবাস। আর রোযা নষ্টকারী অন্য বিষয়গুলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর হাদিসে উল্লেখ করেছেন।

তাই রোযা নষ্টকারী বিষয় ৭টি; সেগুলো হচ্ছে-

১। সহবাস

২। হস্তমৈথুন

৩। পানাহার

৪। যা কিছু পানাহারের স্থলাভিষিক্ত

৫। শিঙ্গা লাগানো কিংবা এ জাতীয় অন্য কোন কারণে রক্ত বের করা

৬। ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করা

৭। মহিলাদের হায়েয ও নিফাসের রক্ত বের হওয়া

এ বিষয়গুলোর মধ্যে প্রথম হচ্ছে- সহবাস; এটি সবচেয়ে বড় রোযা নষ্টকারী বিষয় ও এতে লিপ্ত হলে সবচেয়ে বেশি গুনাহ হয়। যে ব্যক্তি রমযানের দিনের বেলা স্বেচ্ছায় স্ত্রী সহবাস করবে অর্থাৎ দুই খতনার স্থানদ্বয়ের মিলন ঘটাবে এবং পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগ লজ্জাস্থানের ভেতরে অদৃশ্য হয়ে যাবে সে তার রোযা নষ্ট করল; এতে করে বীর্যপাত হোক কিংবা না হোক। তার উপর তওবা করা, সেদিনের রোযা পূর্ণ করা, পরবর্তীতে এ দিনের রোযা কাযা করা ও কঠিন কাফফারা আদায় করা ফরয। এর দলিল হচ্ছে- আবু হুরায়রা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদিস তিনি বলেন: “এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট এসে বলল: ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি ধ্বংস হয়েছি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: কিসে তোমাকে ধ্বংস করল? সে বলল: আমি রমযানে (দিনের বেলা) স্ত্রীর সাথে সহবাস করে ফেলেছি। তিনি বললেন: তুমি কি একটি ক্রীতদাস আযাদ করতে পারবে? সে বলল: না। তিনি বললেন: তাহলে লাগাতার দুই মাস রোযা রাখতে পারবে? সে বলল: না। তিনি বললেন: তাহলে ষাটজন মিসকীনকে খাওয়াতে পারবে? সে বলল: না...[হাদিসটি সহিহ বুখারী (১৯৩৬) ও সহিহ মুসলিমে (১১১১) এসেছে]

স্ত্রী সহবাস ছাড়া অন্য কোন কারণে কাফফারা আদায় করা ওয়াজিব হয় না।

দ্বিতীয়: হস্তমৈথুন। হস্তমৈথুন বলতে বুঝায় হাত দিয়ে কিংবা অন্য কিছু দিয়ে বীর্যপাত করানো। হস্তমৈথুন যে রোযা ভঙ্গকারী এর দলিল হচ্ছে- হাদিসে কুদসীতে রোযাদার সম্পর্কে আল্লাহর বাণী: “সে আমার কারণে পানাহার ও যৌনকর্ম পরিহার করে” সুতরাং যে ব্যক্তি রমযানের দিনের বেলা হস্তমৈথুন করবে তার উপর ফরয হচ্ছে— তওবা করা, সে দিনের বাকী সময় উপবাস থাকা এবং পরবর্তীতে সে রোযাটির কাযা পালন করা। আর যদি এমন হয়— হস্তমৈথুন শুরু করেছে বটে; কিন্তু বীর্যপাতের আগে সে বিরত হয়েছে তাহলে আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে; তার রোযা সহিহ। বীর্যপাত না করার কারণে তাকে রোযাটি কাযা করতে হবে না। রোযাদারের উচিত হচ্ছে— যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী সবকিছু থেকে দূরে থাকা এবং সব কুচিন্তা থেকে নিজের মনকে প্রতিহত করা। আর যদি, মজি বের হয় তাহলে অগ্রগণ্য মতানুযায়ী— এটি রোযা ভঙ্গকারী নয়।

তৃতীয়: পানাহার। পানাহার বলতে বুঝাবে— মুখ দিয়ে কোন কিছু পাকস্থলীতে পৌঁছানো। অনুরূপভাবে নাক দিয়ে কোন কিছু যদি পাকস্থলীতে পৌঁছানো হয় সেটাও পানাহারের পর্যায়ভুক্ত। এ কারণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তুমি ভাল করে নাকে পানি দাও; যদি না তুমি রোযাদার হও।”[সুনানে তিরমিযি (৭৮৮), আলবানি সহিহ তিরমিযিতে হাদিসটিকে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন] সুতরাং নাক দিয়ে পাকস্থলীতে পানি প্রবেশ করানো যদি রোযাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করত তাহলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভাল করে নাকে পানি দিতে নিষেধ করতেন না।

চতুর্থ: যা কিছু পানাহারের স্থলাভিষিক্ত। এটি দুইটি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে। ১. যদি রোযাদারের শরীরে রক্ত পুশ করা হয়। যেমন- আহত হয়ে রক্তক্ষরণের কারণে কারো শরীরে যদি রক্ত পুশ করা হয়; তাহলে সে ব্যক্তির রোযা ভেঙ্গে যাবে। যেহেতু পানাহারের উদ্দেশ্য হচ্ছে— রক্ত তৈরী। ২. খাদ্যের বিকল্প হিসেবে ইনজেকশন পুশ করা। কারণ এমন ইনজেকশন নিলে পানাহারের প্রয়োজন হয় না।[শাইখ উছাইমীনের ‘মাজালিসু শারহি রমাদান’, পৃষ্ঠা- ৭০] তবে, যেসব ইনজেকশন পানাহারের স্থলাভিষিক্ত নয়; বরং চিকিৎসার জন্য দেয়া হয়, উদাহরণতঃ ইনসুলিন, পেনেসিলিন কিংবা শরীর চাঙ্গা করার জন্য দেয়া হয় কিংবা টীকা হিসেবে দেয়া হয় এগুলো রোযা ভঙ্গ করবে না; চাই এসব ইনজেকশন মাংশপেশীতে দেয়া হোক কিংবা শিরাতে দেয়া হোক।[শাইখ মুহাম্মদ বিন ইব্রাহিম এর ফতোয়াসমগ্র (৪/১৮৯)] তবে, সাবধানতা স্বরূপ এসব ইনজেকশন রাতে নেয়া যেতে পারে।

কিডনী ডায়ালাইসিস এর ক্ষেত্রে রোগীর শরীর থেকে রক্ত বের করে সে রক্ত পরিশোধন করে কিছু কেমিক্যাল ও খাদ্য উপাদান (যেমন— সুগার ও লবণ ইত্যাদি) যোগ করে সে রক্ত পুনরায় শরীরে পুশ করা হয়; এতে করে রোযা ভেঙ্গে যাবে।[ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটির ফতোয়াসমগ্র (১০/১৯)]

পঞ্চম: শিঙ্গা লাগানোর মাধ্যমে রক্ত বের করা। দলিল হচ্ছে— নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: “যে ব্যক্তি শিঙ্গা লাগায় ও যার শিঙ্গা লাগানো হয় উভয়ের রোযা ভেঙ্গে যাবে।”[সুনানে আবু দাউদ (২৩৬৭), আলবানী সহিহ আবু দাউদ গ্রন্থে (২০৪৭) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]

রক্ত দেয়াও শিঙ্গা লাগানোর পর্যায়ভুক্ত। কারণ রক্ত দেয়ার ফলে শরীরের উপর শিঙ্গা লাগানোর মত প্রভাব পড়ে। তাই রোযাদারের জন্য রক্ত দেয়া জায়েয নেই। তবে যদি অনন্যোপায় কোন রোগীকে রক্ত দেয়া লাগে তাহলে রক্ত দেয়া জায়েয হবে। রক্ত দানকারীর রোযা ভেঙ্গে যাবে এবং সে দিনের রোযা কাযা করবে।[শাইখ উছাইমীনের ‘মাজালিসু শারহি রামাদান’ পৃষ্ঠা-৭১]

কোন কারণে যে ব্যক্তির রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে— তার রোযা ভাঙ্গবে না; কারণ রক্ত ক্ষরণ তার ইচ্ছাকৃত ছিল না।[স্থায়ী কমিটির ফতোয়াসমগ্র (১০/২৬৪)]

আর দাঁত তোলা, ক্ষতস্থান ড্রেসিং করা কিংবা রক্ত পরীক্ষা করা ইত্যাদি কারণে রোযা ভাঙ্গবে না; কারণ এগুলো শিঙ্গা লাগানোর পর্যায়ভুক্ত নয়। কারণ এগুলো দেহের উপর শিঙ্গা লাগানোর মত প্রভাব ফেলে না।

ষষ্ঠ: ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করা। দলিল হচ্ছে— “যে ব্যক্তিরঅনিচ্ছাকৃতভাবে বমিএসে যায় তাকে উক্ত রোযা কাযা করতে হবে না। কিন্তু যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় বমি করল তাকে সে রোযা কাযা করতে হবে”[সুনানে তিরমিযি (৭২০), আলবানী সহিহ তিরমিযি গ্রন্থে (৫৭৭) হাদিসটিকে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন]

হাদিসে ذرعه শব্দের অর্থ غلبه।

ইবনে মুনযির বলেন: যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত বমি করেছে আলেমদের ঐক্যবদ্ধ অভিমত (ইজমা) হচ্ছে তার রোযা ভেঙ্গে গেছে।[আল-মুগনী (৪/৩৬৮)]

যে ব্যক্তি মুখের ভেতরে হাত দিয়ে কিংবা পেট কচলিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করেছে কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কিছু শুকেছে কিংবা বারবার দেখেছে এক পর্যায়ে তার বমি এসে গেছে তাকেও রোযা কাযা করতে হবে।

তবে যদি কারো পেট ফেঁপে থাকে তার জন্য বমি আটকে রাখা বাধ্যতামূলক নয়; কারণ এতে করে তার স্বাস্থ্যের ক্ষতি হবে।[শাইখ উছাইমীনের মাজালিসু শাহরি রামাদান, পৃষ্ঠা-৭১]

সপ্তম: হায়েয ও নিফাসের রক্ত নির্গত হওয়া। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যখন মহিলাদের হায়েয হয় তখন কি তারা নামায ও রোযা ত্যাগ করে না!?”[সহিহ বুখারী (৩০৪)] তাই কোন নারীর হায়েয কিংবা নিফাসের রক্ত নির্গত হওয়া শুরু হলে তার রোযা ভেঙ্গে যাবে; এমনকি সেটা সূর্যাস্তের সামান্য কিছু সময় পূর্বে হলেও। আর কোন নারী যদি অনুভব করে যে, তার হায়েয শুরু হতে যাচ্ছে; কিন্তু সূর্যাস্তের আগে পর্যন্ত রক্ত বের হয়নি তাহলে তার রোযা শুদ্ধ হবে এবং সেদিনের রোযা তাকে কাযা করতে হবে না।

আর হায়েয ও নিফাসগ্রস্ত নারীর রক্ত যদি রাত থাকতে বন্ধ হয়ে যায় এবং সাথে সাথে তিনি রোযার নিয়ত করে নেন; তবে গোসল করার আগেই ফজরহয়ে যায় সেক্ষেত্রে আলেমদের মাযহাব হচ্ছে— তার রোযা শুদ্ধ হবে।

হায়েযবতী নারীর জন্য উত্তম হচ্ছে তার স্বাভাবিক মাসিক অব্যাহত রাখা এবং আল্লাহ তার জন্য যা নির্ধারণ করে রেখেছেন সেটার উপর সন্তুষ্ট থাকা, হায়েয-রোধকারী কোন কিছু ব্যবহার না-করা। বরং আল্লাহ তার থেকে যেভাবে গ্রহণ করেন সেটা মেনে নেয়া অর্থাৎহায়েয এর সময় রোযা ভাঙ্গা এবং পরবর্তীতে সে রোযা কাযা পালন করা। উম্মুল মুমিনগণ এবং সলফে সালেহীন নারীগণ এভাবেই আমল করতেন।[স্থায়ী কমিটির ফতোয়াসমগ্র (১০/১৫১)]

তাছাড়া চিকিৎসা গবেষণায় হায়েয বা মাসিক রোধকারী এসব উপাদানের বহুমুখী ক্ষতি সাব্যস্ত হয়েছে। এগুলো ব্যবহারের ফলে অনেক নারীর হায়েয অনিয়মিত হয়ে গেছে। তারপরেও কোন নারী যদি হায়েয বন্ধকারী ঔষধ গ্রহণ করার ফলে তার হায়েযের রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যায় এবং জায়গাটি শুকিয়ে যায় সে নারী রোযা রাখতে পারবে এবং তার রোযাটি আদায় হয়ে যাবে।

উল্লেখিত বিষয়গুলো হচ্ছে- রোযা বিনষ্টকারী। তবে, হায়েয ও নিফাস ছাড়া অবশিষ্ট বিষয়গুলো রোযা ভঙ্গ করার জন্য তিনটি শর্ত পূর্ণ হতে হয়:

-রোযা বিনষ্টকারী বিষয়টি ব্যক্তির গোচরীভূত থাকা; অর্থাৎ এ ব্যাপারে সে অজ্ঞ না হয়।

-তার স্মরণে থাকা।

-জোর-জবরদস্তির স্বীকার না হয়ে স্বেচ্ছায় তাতে লিপ্ত হওয়া।

এখন আমরা এমন কিছু বিষয় উল্লেখ করব যেগুলো রোযা নষ্ট করে না:

-এনিমা ব্যবহার, চোখে কিংবা কানে ড্রপ দেয়া, দাঁত তোলা, কোন ক্ষতস্থানের চিকিৎসা নেয়া ইত্যাদি রোযা ভঙ্গ করবে না।[মাজমুউ ফাতাওয়া শাইখুল ইসলাম (২৫/২৩৩, ২৫/২৪৫)]

-হাঁপানি রোগের চিকিৎসা কিংবা অন্য কোন রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে জিহ্বার নীচে যে ট্যাবলেট রাখা হয় সেটা থেকে নির্গত কোন পদার্থ গলার ভিতরে চলে না গেলে সেটা রোযা নষ্ট করবে না।

-মেডিকেল টেস্টের জন্য যোনিপথে যা কিছু ঢুকানো হয়; যেমন- সাপোজিটর, লোশন, কলপোস্কোপ, হাতের আঙ্গুল ইত্যাদি।

-স্পেকুলাম বা আই, ইউ, ডি বা এ জাতীয় কোন মেডিকেল যন্ত্রপাতি জরায়ুর ভেতরে প্রবেশ করালে।

-নারী বা পুরুষের মুত্রনালী দিয়ে যা কিছু প্রবেশ করানো হয়; যেমন- ক্যাথিটার, সিস্টোস্কোপ, এক্সরে এর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত রঞ্জক পদার্থ, ঔষধ, মুত্রথলি পরিস্কার করার জন্য প্রবেশকৃত দ্রবণ।

-দাঁতের রুট ক্যানেল করা, দাঁত ফেলা, মেসওয়াক দিয়ে কিংবা ব্রাশ দিয়ে দাঁত পরিস্কার করা; যদি ব্যক্তি কোন কিছু গলায় চলে গেলে সেগুলো গিলে না ফেলে।

-গড়গড়া কুলি ও চিকিৎসার জন্য মুখে ব্যবহৃত স্প্রে; যদি কোন কিছু গলায় চলে আসলেও ব্যক্তি সেটা গিলে না ফেলে।

-অক্সিজেন, এ্যানেসথেসিয়ার জন্য ব্যবহৃত গ্যাস রোযা ভঙ্গ করবে না; যদি না রোগীকে এর সাথে কোন খাদ্য-দ্রবণ দেয়া হয়।

-চামড়া দিয়ে শরীরে যা কিছু প্রবেশ করে। যেমন- তৈল, মলম, মেডিসিন ও কেমিকেল সম্বলিত ডাক্তারি প্লাস্টার।

-ডাগায়নস্টিক ছবি তোলা কিংবা চিকিৎসার উদ্দেশ্যে হৃৎপিণ্ডের ধমনীতে কিংবা শরীরের অন্য কোন অঙ্গের শিরাতে ছোট একটি টিউব প্রবেশ করানোতে রোযা ভঙ্গ হবে না।

-নাড়ীভুড়ি পরীক্ষা করার জন্য কিংবা অন্য কোন সার্জিকাল অপারেশনের জন্য পেটের ভেতর একটি মেডিকেল স্কোপ প্রবেশ করালেও রোযা ভাঙ্গবে না।

- কলিজা কিংবা অন্য কোন অঙ্গের নমুনাস্বরূপ কিছু অংশ সংগ্রহ করলেও রোযা ভাঙ্গবে না; যদি এ ক্ষেত্রে কোন দ্রবণ গ্রহণ করতে না হয়।

- গ্যাসট্রোস্কোপ (gastroscope) যদিপাকস্থলীতে ঢুকানো তাতে রোযা ভঙ্গ হবে না; যদি না সাথে কোন দ্রবণ ঢুকানো না হয়।

- চিকিৎসার স্বার্থে মস্তিষ্কে কিংবা স্পাইনাল কর্ডে কোন চিকিৎসা যন্ত্র কিংবা কোন ধরণের পদার্থ ঢুকানো হলে রোযা ভঙ্গ হবে না।

আল্লাহই ভাল জানেন।

[দেখুন শাইখ উছাইমীনের ‘মাজালিসু শারহি রামাদান’ ও ‘সিয়াম সংক্রান্ত ৭০টি মাসয়ালা’ নামক এ ওয়েব সাইটের পুস্তিকা]

বাচ্চাদের প্রাথমিক রুকইয়াহ ও বিধিনিষেধ

প্রাথমিক রুকইয়াহ পদ্ধতিঃ  ১।   মানুষ ও জ্বীনের বদনজর ও জ্বীনের আছর থেকে হিফাযত ও শিফার নিয়তে - দুরুদে ইব্রাহিম, সুরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি,...